প্রেম ও তৎপরতার কারনামা ~ ইমরান ফিরদাউস

‘মন না মতি কে শোনে কার কথা’

প্রেম তুমি কি? জৈব রসায়নের বিকার! নাকি মনের বাসনার আকার? প্রেম কি ক্রমে কমে আসে নাকি আসমান থেকে এসে হুড়মুড় করে পড়ে! প্রেম মানে কি…কে জানে…আপনি,আমি বা আমরা? কালের লয়ের সাথে সাথে প্রেমের ক্ষয় হয়,হয়তো!? ‘তবু চিহ্ন থাকে (কি) অবশেষে’? হতে পারে প্রেমের শাহবাগে যাওয়ার কোন ডাইরেক্ট বাস নাই তথাপি পথটাও কুসুমাস্তীর্ণ নয়। যেমন, ধরুন কারো উপর যদি কলেরার টাইমে প্রেম নাজেল হয় তবে কী প্রেম কে হতচ্ছাড়া বলে তাড়া করা যায়!?! যতই পার্বতী বাউল একতারে ধুন তোলেন – ‘বলে না ছিলেমগো…পেয়ারী…পিরীতি করিস না’! তবুও,কারো কারো মনে পেয়েরার সুবাতাসের দিনেও চুপি-চুপি ভীড় করে দুঃখভারাতুর বেশ্যাদের স্মৃতিকথারা।

Shadows-of-Time-poster
এইসব দিন-রাত্রিতে নতুন করে দেখা ফ্লোরিয়ান গ্যালেনবার্গার বিরচিত ইংরেজী সাবটাইটেলে বাংলাভাষী জার্মান সিনেমা ‘শ্যাডোজ অভ টাইম’ ‘প্রেম-পিরীতি’ নিয়ে শুধু আহ্লাদ নয় বরং এভাবে ভাবনের অবকাশ রচনা করে দেয়। পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবিরহাটে গ্যালেনবার্গারের অভিষেক ঘটেছে ‘শ্যাডোজ অভ টাইমের’ সূত্র ধরে। হৃদবীণায় ওংকার তোলা এই রোমান্টিক মেলোড্রামার মাধ্যমে অভিষেকে তিনি দর্শকদের ‘সিনেমা দর্শনের’ পুরনো আসবাব নাড়িয়ে দিয়েছেন। যদিও ‘শ্যাডোজ অভ টাইম’-এ নেই ঘটনার ঘনঘটা, নেই শব্দের/সঙ্গীতের ঝনঝনানি, নেই প্রযুক্তির কেরদানি তারপরো এটি দেখতে দেখতে মনে হয় কারুশৈলী হলো তাই যা বাতলে দেয়  ‘সহজ কথা’ সহজে বলার উপয়াটি। সিনেমা ফুরালে পর্দায় অভ্যাসবশত ভেসে উঠে দ্য এন্ড আর আমার মস্তিষ্কের ইটালিক প্রেসে ছাপা হয় দুই লাইন বিনয় মজুমদার  –  

‘সতত বিশ্বাস হয়, প্রায় সব আয়োজনই হয়ে গেছে, তবু কেবল নির্ভুলভাবে সম্পর্ক স্থাপন করা যায় না এখনো।’

নির্মাতা এথায় আমাদের আলতো টোকা দিয়ে জানিয়ে যান প্রেম শুধু ভালবাসার বাক্স নয়,  জীবনযাত্রা-প্রণালীর অংশও বটে। কিন্তু,আমরা এইখানে শুধুই শ্যাডোজ অভ টাইমের গল্প বা চুলচেরা বিশ্লেষণ করবো না পরন্তু খুঁজে দেখতে চাইবো এই গল্পের ব্যাকড্রপের গল্পটি। সেই গল্প শুনতে হলে আমাদের যেতে হবে অন্য গল্পে…

 

“আপনারা শুনছেন রেডিও জার্মান…”

url

“কোন একদিন সকালে নাস্তার টেবিলে কফির মগে চুমুক দিতে দিতে আর পেপারে চোখ বোলাতে বোলাতে হঠাৎ-ই আমার কান খাড়া হয়ে গেলো! শুনতে পেলাম একজন কিশোরী ভাঙ্গা গলায় বলছে গালিচা কারখানায় তাদের নিদারুণ দিন গুজরানের কথা। ঘটনাটা ঘটছে ভারতে। কিশোরীর ইন্টারভিউ শুনতে শুনতেই আমার মগজের কারখানায় গল্প ছাপা শুরু হয়ে যায়।” এটি ছিল খোদ নির্মাতার কথকতা। যেহেতু ভারতের ঘটনা এবং নির্মাণের তাড়নায় বোম্বে থেকে শুরু করে কলকাতা অবধি ১০ খানা শহর চষে ফেলে শেষমেষ সিটি অভ জয়-কে বেঁছে নেন নির্মাতা। তবে ভায়া জার্মানি কলকাতায় আসা এই সিনেমার পয়লা চমক ছিল ভিনদেশী ভাষায় শ্যুট না করে বাংলা ভাষা ব্যবহার করা। কলকাতাকে নির্বাচনের পেছনে কারণ ছিল এই নগরীর গায়ে ঐতিহাসিকতার ছাপ ও লোকারণ্যে কেমন একটা সাবেকি ঘরানার চাল-চলন। যেন বা  এই শহরের মূহুর্তগুলো অনেক বড় এবং বাতাস কেটে কেটে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে মালুম হয় বিগত মুহুর্ত থেকে আগামী মুহুর্তের নির্গমন। মানে এই সিনেমার জন্য লোকেশনটা হওয়া দরকার ছিল রোমান্টিসিজম আক্রান্ত কোন চরাচর; গ্যালেনবার্গারের চাহিদা অনুযায়ী তার সবটাই হাজির আছে কলকাতায়। কলকাতাকে চোখে না দেখেই নির্মাতা গল্পের ছকে এঁকে ফেলেছিলেন এই শহরের ছবি। সিনেমার অন্যান্য চরিত্রদের পাশাপাশি এই শহরকেও আমরা দেখবো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায়। ঋত্বিক ঘটক এবং সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা দর্শনের মধ্যে দিয়ে শহরটা দেখার পাশাপাশি নির্মাতা টুকে নিতে ভুলেননি কিভাবে টাইম ও স্পেসের সুনিপুণ ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে এই নগরীর সময়টাকে সেলুলয়েড বন্দী করতে হয়। সব এন্তেজাম সমাপ্ত করতঃ দেখা গেল প্রোডাকশন ডিজাইনটা বেশ বাতাস দিচ্ছে ‘একটা দারুণ কিছু হতে চলেছে’র দিকে। তারপর?!

‘আমরা থেকেও-না-থাকা / অশরীরী গোলাপ’

shadowsof time

রবি ও মাশা দুইজন শিশু শ্রমিক কাজ করে স্বাধীনতা পূর্ব ভারতের কলকাতার কোন এক গালিচা কারখানায়। ভারতবর্ষে গালিচা কারখানায় শিশু শ্রমের ব্যবহার অনেকদিনের। তো, ঐ গালিচা কারখানায় রবি একজন একরোখা, মানবিক স্বতন্ত্রতা নিয়ে হাজির থাকে। সেখানে একদিন অন্যান্য কিশোরীদের সাথে মাশাও এসে পড়ে এই কারখানায়। মেলোড্রামার সূত্র ধরে রবিও বয়ঃসন্ধিকালের পয়লা প্রেমে পড়ে যায়। এই কারখানায় কিশোরীদের শ্রমিক হিসাবে ব্যবহারের পাশাপাশি মালিক পক্ষের মনোরঞ্জনে ব্যবহার করা হয়। এবং শহরের গণিকালয়ে বিক্রি করে দেয়া হয়। এর মধ্যে রবি ও মাশার মধ্যে সখ্যতা তৈরি হয়। রবি বুঝতে পেরেছিল মাশার ভাগ্যে কি ঘটতে যাচ্ছে। তাই সে ম্যানেজার কে গিয়ে বলে তার জমানো মজুরি পুরোটা সে দিতে রাজি আছে। এবং ঘটনা পরম্পরায় মাশাকে পালিয়ে যাওয়ার ব্যর্থ সুযোগ করে দেয়া, কারখানার মালিকের কোঠাবাড়ি থেকে মাশার পালিয়ে যাওয়া, এক চক্কর থেকে বেরিয়ে দালালের খপ্পরে পড়ে গণিকালয়ে আটকে পড়া এবং কোন এক পুর্ণিমা রাতে তাদের দেখা হবে শিব মন্দিরে এই আশায় তারা বেড়ে উঠতে থাকে শহরের কোলে। একদিন রবি মুক্ত হয় গালিচা কারখানার শেকল থেকে, ততদিনে ভারত স্বাধীন। আনন্দনগর কলকাতায় আধুনিক নগরীর ছাপ লাগতে শুরু করেছে। এর মধ্যে রবি খুঁজে ফেরে মাশাকে। এতক্ষণে, দর্শক আপনি হয়তো বুঝে গেছেন এই সিনেমার কাহিনী বিন্যাসে আহামরিত্ব নাই, খুবই আন্দাজযোগ্য আখ্যান। মানে এরপর রবির সাথে মাশার দেখা হবে, রবি ততদিনে আরেকজনের ঘরের লোক, কিন্তু প্রথম কবিতার মত প্রথম প্রেমের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে তাদের থাকতে না পারা, মিলন-সন্দেহ-বিচ্ছেদ, এবং দারিদ্র্যের দুষ্টু চক্রের মতন মাশার আবার গণিকা পাড়ায় ফেরত আসা বা দুইটি পরাগায়ন উন্মুখ পুষ্পের ব্যর্থ প্রচেষ্টা – এইতো। তাহলে, এই সিনেমা নিয়ে কেন এত কথার ফুলঝুড়ি। কারণ একটাই-নির্মাতা দক্ষতার সংগে একটি কাব্যিক আখ্যানকে শিশু খাদ্যের মত সরলভাবে হজম করার সুযোগটা প্রথম থেকেই হাজির রেখেছেন এই সিনেমায়। ফলতঃ শ্যাডোজ অভ টাইম দর্শকদের সুযোগ করে দেয় গল্পের মনোরম দৃশ্যমালা বা ঘটনাবলীর চেয়ে চরিত্রগুলির দ্বন্দ্ব, অপলাপের উপর অধিক মনোযোগী হবার। পয়লা বার বড় ছবি নির্মাণ করতে ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়ে গ্যালেনবার্গার দারুণ মুন্সিয়ানার সাথে পুরো আয়োজনের মধ্যে অবলীলায় ছড়িয়ে দিয়েছেন নিজস্ব শৈলী ইন্দ্রিয়ের অনুপ্রাণনা।

জীবন একটা সিনেমা যা সুনির্মিত নয়

ইন্ডিয়ায় সিনেমা করতে আসা ভিনদেশী নির্মাতাদের মাঝে মুম্বাই আর কলকাতা প্রীতি ব্যাপক। কেন এমন হয় তার কোন প্রামাণ্য কারণ জানা না গেলেও এইটা নিশ্চিত যে, নিয়ন আলোয় স্বাগতম জানানো শহরদ্বয় অফার করে উন্নয়ন-দরদী বস্তি-দারিদ্র্য এবং বাস্তবতার হরেক রকম প্রতিচিত্র। ক্যামেরার চোখে এই শহরগুলি নিজেই একটা চরিত্র হয়ে ধরা দেয়।  যেমন, কলকাতার প্রতিবেশ, পরিবেশ, ব্যাকড্রপে হাওড়া ব্রীজ, লোকালয় সহ – সবকিছু শিল্প নির্দেশনার নিখুঁত আয়োজনে মূক থেকেই সরব হয়ে উঠে আলাদা চরিত্ররূপে। চিত্রনাট্যের প্রশ্নে শ্যাডোজ অভ টাইম কাকতালীয় কারবার, আকস্মিক ঘটনা, নিয়তিচালিত সিদ্ধান্ত ও নীরব আকাঙ্ক্ষার চাহনি দিয়ে ঠাঁসা একটি বয়ান। কাহিনীর এমনতর আখ্যানে দর্শক নিয়ত খুঁজে পায় যাপিত জীবনের বিবিধ প্রসঙ্গ। সর্বোপরি, গল্পের ভিতর এসব নোক্তা কাজ করে মোটিফ হিসাবে যা পুরো নিবন্ধকে এক সুঁতোয় বয়ন করে যেথায় ফোঁড়ন রূপে স্বচ্ছন্দভাবে চলাফেরা করে আখ্যানের অনুবত্তি, লোকালয়ের ভীড়ের মধ্যে চরিত্রদের মিশে যাওয়ার মত প্রাঞ্জল মূহুর্ত, ঘটনার ঘনঘটায় চরিত্রদের নিস্তরণ এবং ভাগ্যের বাতিকগ্রস্থতার দরুণ পুনর্মিলন ও বিচ্ছেদের মতন প্রপঞ্চরাজি। গ্যালেনবার্গারের স্ক্রিপ্ট অসাধারণভাবে মেদহীন ও ফোকাসড, মানসিক চাঞ্চল্যের মূহুর্তে চরিত্রদের অকপট ভঙ্গিমা আর দশটা বলিউড সিনেমার তারল্য থেকে একে আলাদা করেছে। যেমন অনেক বছর বাদে কাকতালীয়ভাবে রবি ও মাশার যখন দেখা হয় একটা ঝাঁ চকচকে পার্টিতে এবং ঘটমান বাস্তবতার ভেতরে নিজেদের আবিষ্কার করে তখন প্রচলিত ফর্মুলার মত ভুল বোঝাবুঝির পালা দীর্ঘায়িত না হয়ে বরং গোপন অভিসারের মিষ্টি গন্ধ ও স্বাদে ভরপুর হয়ে উঠে। পর্দায় শান্তভাবে জারি থাকে তাদের আপাত উতাল-পাথাল প্রেম।

চরিত্র রূপায়ণে কুশীলব নির্বাচন বা কাস্টিং এক অর্থে মূল জ্বালানি এ ছায়াছবির। প্রাপ্তবয়স্ক রবির চরিত্রে প্রশান্ত নারায়ণ, বড়বেলার মাশার ভূমিকায় তন্নিষ্ঠা চ্যাটার্জী, ইয়ানি মিশ্রর চরিত্রে ইরফান খান এবং দীপার নাম ভূমিকায় তিলোত্তমা সোমের অভিনয়ের কুদরতে সিনেমার দ্বিতীয় অংশ ক্লান্তিকর হওয়ার সম্ভাবনা থেকে এ যাত্রায় বেঁচে যায়। সিনেমাটার প্রথম অংশ দেখে অনেকের মনে হতে পারে এইটা কি স্লামডগ মিলিওনিয়ারের কপি কি না…তাদের জন্য উল্লেখ থাকুক এটি স্লামডগের আগেই নির্মিত; বলা যেতে পারে স্লামডগ অনেক ক্ষেত্রে শ্যাডোজ অভ টাইম থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছে।

সামগ্রিকভাবে, শ্যাডোজ অভ টাইম এমন একটি ছবি যেটি মনে হতেই পারে বোদ্ধা আর্ট-হাউজ দর্শকদের জন্য নির্মিত কিন্তু এটি তথাকথিত বিনোদনগামী দর্শকদেরও হতাশ করবে না বলেই মনে হয়। এখন প্রশ্ন হলো এই সিনেমা দর্শনে,আমাদের সিনেমা-জীবনের কী ক্ষতি-বৃদ্ধি হলো! বৃদ্ধি হলো এই যে,আমরা জানলাম সিনেমা এমনও হয় আর ক্ষতি হলো যে আমাদের মনে নতুন আকাঙ্খার প্রসার ঘটলো এমনতর সিনেমা বারবার দেখার জন্য। কিন্তু,এমন সিনেমা প্রতিদিন হচ্ছে কোথায়! উলটো ইদানিং দেখতে পাচ্ছি সি-নে-মা-ই ক্রমশ জীবন হয়ে উঠার শঙ্খনাদ জানাচ্ছে। এমন প্রকৃতি-প্রাণের পুরাণ দেখার বাসনায় অপেক্ষার মাঝে ভাবছি এই লেখাটার শিরোনামা হয়তোবা হইতে পারতো কালের কার্নিশে (সহজ) প্রেমের এক চিলতে রোদ্দুরের গীতমালা…।

 

প্রথম প্রকাশ: আলোকিত বাংলাদেশ,২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

1

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s