তেলে ভাসছে সুন্দরবন, মুনাফায় ভাসছে ব্রহ্মাণ্ড ~ ইমরান ফিরদাউস

“…হরিণ কমে যাচ্ছে সুন্দরবনে ক্রমশ, সুন্দরী কাঠের তৈরী

কোমল কার্পেট থেকে বেরিয়ে আসছে একটা খাদ্যবাহী জাহাজ। …” ~ জন্ম – আবুল হাসান

সুন্দরবনের বাঘ, হরিণ, চিতা, চিলের সাম্রাজ্য ভরা আকাশ-বাতাসে এখনো ভারী হয়ে আছে বিপন্ন কালো। প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশের অপমানের আঁচড়ে বিষণ্ণ তার ভূগোল। পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন আজ নিজেই ধুঁকছে অক্সিজেনহীনতায়। গাছের শ্বাসমূলে লেগে আছে তেল। শ্যালা নদীতে আর লাফিয়ে উঠছে না ইরাবতী ডলফিন। স্থানীয় জলজ, খেচর ও উভচর প্রাণীরা বয়ে বেড়াচ্ছে মানবসৃষ্ট বিপর্যয় থুড়ি দায়িত্বহীনতার নিশানা। বলাই বাহুল্য- হুমকির মুখোমুখি এখন সুন্দরবন বা বাদাবনের অন্যন্য বাস্তুতান্ত্রিক দশাও। অন্যন্য এই কারণে যে- পৃথিবীতে চারটি বাস্তুতান্ত্রিক অবস্থা আছে। যেমন: সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র, নদী-বাস্তুতন্ত্র, মোহনা-বাস্তুতন্ত্র এবং স্থলজ বাস্তুতন্ত্র। এই সবগুলো বাস্তুতন্ত্রের সমন্বয়ে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র সৃষ্টি হয়েছে প্রাকৃতিকভাবে। যা অবস্থিত বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরের পাড় ঘেঁষে বহু নদী মোহনার মিলনস্থলে। এহেন উদাহরণ ভৌগলিকভাবে সারা পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই!

কিভাবে ঘটলো এই বিপর্যয় বা কোন স্বার্থে একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মাঝে দিয়ে নৌ-পরিবহনের অনুমতি দেয়া হয়? যখন গণমাধ্যমের বরাতে আমরা প্রায় সবাই জানি, ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ, বিশ্বের বৃহত্তম চিরহরিৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, হোম অব রয়েল বেঙ্গল টাইগার এ রকম অনেক বিশেষণে বিশেষায়িত হয়েছে সুন্দরবন।

চলুন, তাহলে নজর ফেরানো যাক সেই ঘটনার দিকে…

নয় ডিসেম্বর। দুই হাজার চৌদ্দ সাল। ভোর বেলাটা আর সবদিনের মতই। সেইক্ষণে দুটি তেলবাহী কার্গো বোটের সংঘর্ষে ‘এমটি সাউদার্ন স্টার-৭’ নামের তথাকথিত কার্গো (যেটি আসলে বালুবহনে ব্যবহৃত বাল্কহেড কার্গো)ডুবে গেলে তিন লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৪ লিটার ফার্নেস তেল ছড়িয়ে পড়ে শ্যালা নদীসহ চাঁদপাই রেঞ্জের প্রায় ২০টি খাল, দুটি ভাড়ানী, শীষে খাল, ঝোরা ও বনস্তরে। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর থেকে লাইসেন্সের তোয়াক্কা না করে পেট্রোবাংলার কাছ থেকে ছাড়পত্র নিয়ে হঠাৎ করেই কার্গোটির নাম পাল্টে জ্বালানি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে রূপান্তর করা হয়।

কয়েক বছর ধরে অসংখ্য মালবাহী জাহাজসহ নানা ধরনের জলযান সুন্দরবনের পূর্ব পাশ ধরে বয়ে চলা শ্যালা নদীতে চলাচল করে। মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও অন্যান্য দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মতে, এটি একটি অননুমোদিত নৌরুট।

অননুমোদিত নৌরুট!?!

তাহলে, অনুমোদিত নৌরুট কোনটি, কোথায়?

অনুমোদিত রুটটি ছিলো মংলা-ঘষিয়াখালী-মোরেলগঞ্জের নৌ-রুট। যা দুই হাজার এগারো সালে এপ্রিল মাসে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় নাব্যতা সঙ্কট বা পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়া। বিকল্প রুট হিসেবে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে দিয়ে বলেশ্বর-জয়মনি রুট চালু করে নৌ-পরিহবহন মন্ত্রণালয়। যদিও, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ (সংশোধন) আইন ২০১০-এর ৩নং বিধি অনুযায়ী, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার জলাভূমির বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন বা নষ্ট করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। পাশাপাশি, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন  ২০১২ অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনে নৌপথসহ সকল ধরনের কর্মকাণ্ডই আইনত নিষিদ্ধ।

তথাপি, আপদকালীন দশা হিসেবে মাত্র তিনমাস এই নৌরুটের ব্যবহারের কথা থাকলেও এটি প্রায় চার বছর ধরে চালু রয়েছে। প্রতিদিন দুইশো নৌ-যান এই পথ ব্যবহার করতে পারবে বলে ঘোষণা করে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশের মংলা বন্দর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে অন্যান্য অংশের সাথে মালামাল পরিবহনে নৌযানগুলোকে সুন্দরবনের ভেতর দিয়েই যাতায়াত করতে হয়। ফলে, নৌযানগুলোর উচ্চ শব্দ, আলো, বর্জ্য ও ব্যবহৃত তেল নিষ্কাশনসহ নানা ধরনের অসুবিধা তৈরি হয় বাদাবনজুড়ে—যেগুলোর প্রতি সংশ্লিষ্ট মহলের কোনই উচ্চবাচ্য শোনা যায়নি। যদিও কিছু কিছু পরিবেশবাদী সংগঠন ও সচেতন গোষ্ঠী এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ ও আপত্তি জানিয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরেই। প্রকাশ থাকুক, যে শ্যালা নদী এহেন দূষণের শিকার হচ্ছে, সেই শ্যালা নদীই বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক দুর্লভ প্রজাতির গাঙ্গেয় ডলফিন ও ইরাবতী ডলফিনের অভয়াশ্রম হিসেবে স্বীকৃত।  এই নদীর শাখা-প্রশাখা, সংযোগকারী খাল, জলাভূমি এবং জোয়ার-ভাটার মধ্যবর্তী অঞ্চল কুমিরের আবাসস্থল এবং প্রজনন ও ডিম পাড়ার জন্য প্রসিদ্ধ। এই অঞ্চলটি মাছের প্রজননক্ষেত্র, সেই সাথে কাঁকড়া, পরিযায়ী পাখি, দুর্লভ প্রজাতির হাঁস এবং অন্যান্য জীবজন্তুর বিচরণক্ষেত্রও বটে।

যে বাদাবন রাষ্ট্রের কাছে শুধু কাঠ-কয়লা-আরো আরো সম্পদের আধার হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে, সেই সুন্দরবন কিন্তু স্থানীয় অধিবাসীদের জীবনের খুব নিকটের আত্মীয়। তাই, মর্মান্তিক হলেও সত্যি যে, সরকার যখন দুইদিন পার হবার পরও তেল বা ডুবে থাকা ট্যাঙ্কার সরানোর বিষয়ে কোন উদ্যোগী ভূমিকা নেয় না…ঠিক তখন সুন্দরবনের গতর থেকে ফারনেস তেলের আস্তরণ সরিয়ে জলের কঙ্কাল উদ্ধারে নিয়োজিত হয় স্থানীয় মানুষরাই। স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে ভ্রুক্ষেপ না করেই আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলেই নেমে পড়ে কাজে। তারাই যেন লোকায়ত সংস্কৃতি থেকে উঠে আসা আজকের বনবিবি বা গাজীপীর বা দক্ষিণ রায় বা কালু রায় বা মাকাল ঠাকুর। যেনবা সুন্দরবনের দেব-দেবীরা একই সঙ্গে স্থানীয় লোকসমাজের নানা ধর্মের লোকদের নৈবেদ্য দিতে হাজির হয়েছেন তীব্র মানুষের জামা গায়ে। তাদের নিরলস শ্রমে, বাঁচবার তাগিদে ও  নিজেদের অজানা ভবিষ্যত নিয়ন্ত্রণের এই প্রচেষ্টায় সরানো যায় সাতষট্টি হাজার লিটার তেল। প্রথমে লিটার প্রতি বিশ, পরে ত্রিশ ও শেষ খবর অনুযায়ী চল্লিশ টাকা দরে নদী থেকে উঠানো তেল কিনে নেয়ার ঘোষণা দেয় পদ্মা অয়েল কোম্পানি। কিন্তু, ততদিনে ফারনেস তেলের চিটচিটে প্রলেপে সুন্দরবন পাড়ি দিয়েছে চৌদ্দটি জোয়ার-ভাটা। ফলে, জল-স্থল সবখানেই ঘটেছে তেলের বহুমুখী বিস্তার। আর অবধারিতভাবে ধরিত্রীর প্রাণ রক্ষায় যারা ত্রাণকর্মীর ভূমিকায় পানিতে নামলেন, গায়ে মাখলেন ফারনেসের কালিমা তারাও ক্রমে ক্রমে ভুগতে শুরু করেন আন্ত্রিক সমস্যা, চোখ জ্বালাপোড়া, ত্বকে সমস্যার মত নানাবিধ রোগে।

বাদাবনের এই বিপর্যয় শুধু প্রাণতন্ত্রকেই হুমকির মুখে ফেলেনি, অস্তিত্বের সঙ্কটে ফেলেছে স্থানীয় অধিবসীদের পেশা ও জীবনযাপনকেও। যেহেতু, জীবনধারণের তাগিদে বনজীবী ও অধিবাসীদের লোকাল মাইগ্রেশনের শিকার হতে হবে; সেহেতু হুমকির মুখে পড়বে  সনাতনী-ইসলাম-সর্বপ্রাণবাদী সংস্কৃতির মিশেলে এক অনন্য লোকধর্ম।

দুঃখজনক হলেও সত্যি, বনের নাজুক প্রতিবেশরীতিকে  আমলে না এনে রাষ্ট্র-সরকার একে মুনাফার খনি বলেই বরাবর জ্ঞান করে আসছে। প্রাণ-প্রকৃতি ও বনজীবীদের ভালোমন্দ বোঝার চাইতে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও দাতা সংস্থাদের প্রেসক্রিপশনের উপর তাদের অগাধ আস্থা। উপরন্তু, রাষ্ট্র বনজীবীদের দায়ী করছে সুন্দরবনের পরিবেশ নষ্ট করার অভিযোগে। যা সর্বৈব অসত্য প্রমাণ করে টিকে থাকছে বনজীবীদের বাদাবনবিজ্ঞান। বনজীবীদের ঝেঁটিয়ে বিদেয় করতে পারলে বা কেড়ে নিতে পারলে এই সব বহুজাতিক কোম্পানি ও দাতা সংস্থারা করতে পারবে একতরফা লুটতরাজ, হবে বনজ এলাকা সংরক্ষণের আড়ালে প্রাণ-প্রতিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ডের বৈধতাদান। এবং ভৌগলিক রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলের মোড়ল হয়ে উঠতে আর তেমন কোন সমস্যাই (হয়তো) হবে না।  নতুবা, দুইহাজার এগারো সালে চব্বিশে নভেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে নৌরুট বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়ার পরও…এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হচ্ছে জ্বালানী তেল, কয়লাসহ বিবিধ বস্তু। আর প্রতিটি অবহেলার পর রাষ্ট্র সেসবের গায়ে দিয়ে দিচ্ছে ‘দুর্ঘটনা’র তকমা।  ভুলে যাচ্ছে এই সুন্দরবনই সিডর-আইলার মত জলোচ্ছ্বাস থেকে বাংলাদেশকে সুরক্ষা দিয়েছে মায়ের আঁচলের মতন!  প্রাকৃতিক সবুজ ফুসফুস হিসেবে সুন্দরবন যে ভূমিকা রাখছে সেটি কী আদৌ মুদ্রার হিসেবে পরিগণন সম্ভব!? এর পাশাপাশি ভারত-বাংলাদেশের যৌথ চুক্তিতে সুন্দরবন থেকে মাত্র চৌদ্দ কিলোমিটার উত্তরে বাগেরহাটের রামপালে এক হাজার আটশো চৌত্রিশ একর এলাকায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো অরণ্য ও অরণ্যচারী জনগোষ্ঠীর বসতির পনেরো থেকে বিশ কিলোমিটারের ভেতর জ্বালানি প্ল্যান্ট তৈরির অনুমতি ইতিপূর্বে পৃথিবীর কোনো দেশেই কখনো দেওয়া হয়নি। এবং এর ফলে ঐ এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশধর্ম যে পরিমাণ বিচ্যুতির শিকার হবে, তা ঐ চুক্তিতে কোন আমলেই রাখা হয়নি। কবি মাইকেল মধুসূদন হয়তো পরলোকে বসে এসব দেখছেন আর ভাবছেন (হয়তো)সময় হয়েছে স্বরচিত প্রহসন ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ পুনর্লিখনের!

সুন্দরবনের এই তেল বিপর্যয় শুধুই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়…জানেন তো- দিন শেষে আমরা সবাই মাদার আর্থের-ই  সন্তান। শুধু মানববন্ধন, ফেসবুক ইভেন্ট, টুইটারে হ্যাশট্যাগ আর প্ল্যাকার্ড বন্দী প্রতিবাদের মধ্যে দিয়ে মাদার আর্থের এই দ্গদ্গে ঘা উপশম হবার নয়। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার স্বীকার হতে হবে দুনিয়ার সব মানুষকেই। এখন সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনটি আপনার যাপনের জন্য অধিক জরুরী- দানবীয় উন্নয়ন নাকি প্রাণ-প্রকৃতির আবাহন!  ঐতিহাসিক সত্য হলো মানুষ থাকুক বা না থাকুক প্রকৃতি কিন্তু ঠিকই অরণ্য-বনানী-বিটপিতে চিরসবুজ থাকতে জানে…জানে প্রাণের আদরটুকুন বাটোয়ার করতে। শতবর্ষ আগে এজন্যই ঐতিহাসিক শ্রী সতীশ চন্দ্র মিত্র ‘যশোহর খুলনার ইতিহাস’ বহিতে লিখে গেছেন, “নাম যাহাই থাকুক সুন্দরবন চিরকাল আছে। হয়ত ইহা পূর্বে যেখানে ছিল এখন সেখানে নাই, কিন্তু ইহা চিরকাল আছে।”

 সহায়ক তথ্যসূত্র

১. খান, মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন, ২০১৫, বাংলাদেশের বন সংরক্ষণে সহব্যবস্থাপনা ও কর্পোরেট স্বার্থ, সর্বজনকথা, ১ম বর্ষ:২য় সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি, ঢাকা

২. চৌধুরী, আব্দুল্লাহ হারুন, ২০১৫, সুন্দরবনে তেলবিপর্যয়: গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ, সর্বজনকথা, ১ম বর্ষ:২য় সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি, ঢাকা

৩. পার্থ,পাভেল, ২০১৫, সুন্দরবনে তেলবিপর্যয়: একটি প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ নমুনা, সর্বজনকথা, ১ম বর্ষ:২য় সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি, ঢাকা

৪.  ফাল্গুনী,অদিতি, স্নেহ বলে সুন্দরবন মাতা, বাহুবলে রাজা, জুন ১০, ২০১৩, প্রথম আলো

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s