সুন্দরবনের তেল বিপর্যয় নিয়ে মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খানের সাথে ইমরান ফিরদাউসের আলাপ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান সুন্দরবনে সাম্প্রতিক তেল বিপর্যয়ের ঘটনাটি সরেজমিন দেখতে একটি বিশেষজ্ঞ দলের সাথে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। তাঁর আগ্রহের বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক প্রতিবেশ।

ইমরান ফিরদাউস:  সুন্দরবন আসলে কী?

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান: মুশকিল হচ্ছে সুন্দরবনকে বন দিসেবে দেখার কারণে বনের ব্যবস্থাপনাটা আর দশটা বনের মতই চিন্তা করা হয়। সুন্দরবন তো আসলে রীতিমত একটা জলাভূমি। যেটাকে আমরা বাদাবন বলি। জলাভূমির যে ব্যবস্থাপনা সেটা আমাদের যে ভূমিভিত্তিক বন আছে তার থেকে একেবারে ভিন্ন বিষয়। তারউপর সুন্দরবন খুবই রহস্যময় একটা জলাভূমি, সেই রহস্যটাই আমরা আসলে উন্মোচন করে উঠতে পারিনি। এখন সেই রহস্য আমরা উন্মোচন করতে পারিনি অথচ বিভিন্ন রকমের ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করছি, যেটা আসলে সুন্দরবনের বাস্তবতার সাথে কখনো কখনও খুবই অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে হয়। তো, এরকম বাস্তবতায় যে ঘটোনাগুলো ঘটছে তা খুব দুঃখজনক। সুন্দরবনের আশেপাশের এবং সুন্দরবনজুড়ে একরকমের শিল্পায়নের প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। যেমন- রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাথে ওরিঅন বিদ্যুৎকেন্দ্র, বাংলাদেশ নেভীর কিছু প্রকল্প আছে, বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের কিছু পরিকল্পনা আছে। এবং এ উদ্দেশ্যে এরমধ্যেই জয়মুনির কাছাকাছি এলাকায় ভূমি গ্রহণের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সুন্দরবনকে ঘিরে যদি এ ধরনের কিছু উন্নয়ন পরিকল্পনা থাকে তার মানে কর্তৃপক্ষ আসলে সুন্দরবনকে ‘বন’ মনে করছে না বরং ‘শিল্পাঞ্চল’ হিসেবে গড়ে তোলার একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে সুন্দরবন আছে।

ইমরান ফিরদাউস:  সুন্দরবনকে ঘিরে এধরনের ভাবনার কারণ কী?

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান: সতীশ চন্দ্র মিত্র ‘যশোহর খুলনার ইতিহাস’ বইতে বলছেন, ‘দেশের অনেক কিছুর পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে কিন্তু সুন্দরবনের দেশরক্ষার কাজে কোন পরিবর্তন আসেনি’ এইটুকু অনুধাবন করলে আসলে সুন্দরবনকে না-বোঝার কিছু নাই। এখন বিষয় হচ্ছে আমি এটা অনুধাবন করছি কি না!? আর সুন্দরবন তো পুরো মানবজাতির সম্পদ। শুধু বাংলাদেশের বা বাংলাদেশকে ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে রক্ষা করে তা নয়। ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট বা বাদাবনের কমে আসা এবং তার মধ্যে সুন্দরবনের টিকে থাকা এটি একটি অন্যন্য সম্পদ। এই সম্পদের প্রতি আমাদের উদাসীন থাকা কিংবা সম্পদকে ঘিরে এধরনের (উন্নয়ন প্রকল্প আমি বলি না) অপউন্নয়ন প্রকল্প আমাদের অস্তিত্বকে আমি মনে করি আরো সংকটের মুখে ঠেলে দিবে।

ইমরান ফিরদাউস:  সুন্দরবনে সাম্প্রতিকসময়ে ঘটে যাওয়া তেল বিপর্যয়ের ঘটনায় সরকারের ভূমিকা এবং তেল অপসারণে স্থানীয় মানুষের সক্রিয়তার বিষয়টি কিছু বলুন।

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান: আমি ঘটনাস্থলে গিয়েছি এবং ছিলাম সেখানে। বিশেষ করে, সে তথাকথিত অয়েল ট্যাঙ্কারটিকে সরানো হয় তখনো ছিলাম। একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সেটাকে নিরসন করা বা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনাটা খুবই যৌক্তিক ছিল। তা করার জন্য অনেক কিছু যে করতে হতো তাও নয়। আমি যখন গেলাম সেখানে ঠিক তার আগ মূহুর্তেই ছোট একটা বেসরকারি উদ্ধার লঞ্চ দিয়ে সেই অয়েল ট্যাঙ্কারটি সরিয়ে নিতে মাত্র দশ-পনেরো মিনিট সময় লেগেছে। আর এটি হয়েছে তথাকথিত অয়েল ট্যাঙ্কার জাহাজটির মালিক পক্ষের উদ্যোগেই। তাহলে এই কাজটা যদি প্রথমদিনেই করা হতো তাহলে এমন বিপদের মুখে আমাদের পড়তে হতো না। স্থানীয় মানুষের জীবনধারণ-যাপন যেহেতু এই জলাভূমির উপর নির্ভর করে, সেহেতু তারা এই বিপদটা ভালো করে বুঝেছেন। আর বুঝেছেন বলেই নিজেদের স্বাস্থ্যঝুঁকির পরেও হাত দিয়ে, হাঁড়ি-পাতিল দিয়ে তেল সরিয়েছেন। এবং যে ঘোষণাটা সরকার করেছে তেল কিনে নেওয়ার প্রশ্নে…সেটাও কোন পরিকল্পিত ঘোষণা নয়। উনারা যাওয়ার পথে দেখেছেন স্থানীয়দের উদ্যোগটি এবং সেটিকেই প্রাতিষ্ঠানিকরণের চেষ্টা করেছেন অর্থের বিনিময়ে। এর মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্রের যে দায়িত্ব সেটাকেই ঢেকে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। যে কাজটা করতে সরকার-রাষ্ট্রের দশ-পনেরো মিনিট লাগতো এবং ঘটনার দিনই প্রথম দুই-এক ঘন্টার মধ্যে সেরে ফেলা যেতো , সেটি করতে পার হয়ে গেলো দুই দিন। যদিও, সেখানে রাষ্ট্রের একাধিক অথরিটি হাজির ছিলো তথাপি দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসা বা কার দায়িত্ব এই কাজটা করা- তা নিয়ে সমন্বয়হীনতাই পুরো পরিস্থিতিকে বর্তমান অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়েছে। আমরা জোয়ার-ভাটা দুই সময়েই গেছি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে এবং ভাটার সময় দেখা গেছে তেলের বিপর্যয়ের মাত্রাটা কত গভীর। দেখে মনে হয়েছে নদীর দুই পাড় জুড়ে কেউ যেন কালো পেইন্ট করে দিয়েছে।

ইমরান ফিরদাউস:  এই ঘটনার পর জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী (ইউএনডিপি) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান: এখন ইউএনডিপি যে মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি করেছে সেটি যে নিরপেক্ষ অন্তত আমি তা মনে করি না। কারণ, দুর্ঘটনার পরে যে বিপর্যয় সেখানে সরকারই আসলে ব্যর্থ এবং সরকারই দায়ী। কোন কাজে যে দায়ী, তাকে সাথে নিয়েই যখন কোন তদন্ত হয় তখন সেটি নিরপেক্ষ থাকে কি না তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে।  ইউএনডিপির রিপোর্টের ক্ষেত্রে এটাই আমার কাছে সবচেয়ে প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থান বলে মনে হয়েছে।  এবং সরকারকে পাশে নিয়ে যখন সংবাদ সম্মেলন করা হয় তখন বলাই যে এই প্রতিবেদনের নৈতিক ভিত্তিটি খুব দুর্বল।

ইমরান ফিরদাউস:  যেখানে সংরক্ষিত বন অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে নৌযান চলাচল আইনত নিষিদ্ধ সেখানে এর আগেও একাধিকবার দুর্ঘটনা ঘটা সত্ত্বেও শ্যালা নদীর এই রুটটি বন্ধ করা যাচ্ছে না কেন?

Mohammad Tanzimuddin Khan
Mohammad Tanzimuddin Khan

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান: শ্যালা নদীকে ঘিরে একধরনের রাজনৈতিক-অর্থনীতি আছে। নদীপথে যে নৌযানগুলি যাতায়াত করে সেগুলো কিন্তু একটা ভয়ংকর দুর্নীতিগ্রস্থ প্রক্রিয়াকে টিকিয়ে রেখেছে। এই অর্থের হিস্যা অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ধরনের অর্থনৈতিক স্বার্থ যখন তৈরি হয় তখন সুন্দরবনকে টিকিয়ে রাখার চেয়ে ধ্বংস করার গতিটা আরো বেশি ত্বরান্বিত হয়।

ইমরান ফিরদাউস:  পলিটিক্যাল-ইকোলজির দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুর্ঘটনাকে কিভাবে বিশ্লেষণ করা যায়?

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান: পলিটিক্যাল-ইকোলজির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলা যায়- রাষ্ট্র (রাষ্ট্র পরিচালনায় যারা আছেন) ভয়ংকরভাবে অর্থলিপ্সু। সেখানে মানুষ কী আর প্রকৃতি কী_কোনকিছুই তাদের বিবেচনায় নাই। যার ফলে আমরা রানা প্লাজার ক্ষেত্রেও দেখেছি একইরকম।  সুন্দরবনের ক্ষেত্রেও দেখেছি, যে মানুষগুলো আসলে এই প্রক্রিয়ার মধ্যে নাই কিংবা এখনো অর্থলিপ্সু হয়ে উঠতে পারে নাই তারাই দেখা যাচ্ছে এই রকম দুর্যোগের সময় ঝাঁপিয়ে পড়ছে। রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন যারা তাদের মধ্যে যদি ঐ মানবিকতা বোধটুকু না থাকে বা কল্যাণবোধ না থাকে, অর্থলিপ্সা দিয়েই যদি উনারা পরিচালিত হন তাহলে সুন্দরবন কেন, যে কোন এই ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করতে উনারা কুন্ঠাবোধ করবেন না। এবং সেটাই হচ্ছে। সবকিছুই সেখানে মুনাফা দিয়ে পরিমাপ করা হয়। এটাকে শুধু বাংলাদেশের পার্সপেকটিভ থেকে দেখলে হবে না। এই ঘটনার বা এই চর্চার যে বিশ্বময়তা এবং বৈশ্বিক পর্যায়েও যে একটা চক্র কাজ করে আমার মনে হয় ইউএনডিপি নিজেই এবার সেই নজির হাজির করেছে।

ইমরান ফিরদাউস:  এই ঘটনার পর ক্লাইমেট চেঞ্জের রাজনীতিতে সুন্দরবনের প্রভাব বা গুরুত্ব হ্রাস পাবে?জলবায়ু পরিবর্তন রাজনীতির এইসব দিনরাত্রিতে ‘কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ’ জনিত আলাপে

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান: সেই কন্টেক্সটে বলে যায় কার্বন নিঃসরণ তো খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। অন্য যে কোন বনের চাইতে ম্যানগ্রোভ বনের কার্বন জমিয়ে রাখার ক্ষমতা চার থেকে আঠারোগুণ বেশি।  জলবায়ু রাজনীতির যে প্রেক্ষাপট সেখানেও সুন্দরবনকে নতুন করে বিবেচনায় নেওয়াটা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

Imran Firdaus
Imran Firdaus

ইমরান ফিরদাউস: সুন্দরবনের একটি অংশ তো ভারতের মধ্যেও আছে। তেল বিপর্যয়ে কারণে আশু দূষণ থেকে সেটি কি নিরাপদ অবস্থানে আছে?

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান: বাংলাদেশে সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া মানে সামগ্রিকভাবে সুন্দরবনের ক্ষতি হওয়া। এবার তেল নিঃসরণের পর ভারতের সুন্দরবনে দূষণ হচ্ছে কি না সে বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের পল্যুশন কন্ট্রোল বোর্ডের চেয়ারম্যান কল্যাণ রুদ্রও সতর্কতার কথা বলেছেন। রামপাল পাওয়ার প্ল্যান্ট বাংলাদেশে অবস্থিত হওয়ার কারণে তারা যদি মনে করেন সুরক্ষিত থাকবেন, তা কিন্তু আসলে নয়। সুতরাং, সুন্দরবনকে শুধু বাংলাদেশে, ভারত নয় সমগ্র বিশ্ববাসীর সম্পদরূপে বিবেচনা করতে হবে। বনকে পণ্য বানানোর যে প্রক্রিয়ার ভারত, বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যৌথভাবে যে উদ্যোগ নিয়েছে সেটি থেকে বাদাবনকে রক্ষা করতে হলে আসলে মানুষের পর্যায় থেকেই উদ্যোগ নিতে হবে।

** Banner Credit: Typography Art by Syed Mohammad Tayab
Photo by Shuvro Kanti Das 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s