ঠগী জীবনের আয়নায় প্রেমের রেশমী ফাঁস – ইমরান ফিরদাউস

মিডিয়াপ্রবণ মৃদু মানুষের লোক-সংসারে মহাশ্বেতা দেবী ছিলেন,আছেন প্রতিবাদ,প্রতিরোধ আর অনর্গল জিন্দেগির শ্বাশত রিপ্রেজেন্টেশন হয়ে।

নিরাপত্তার চাদরে মোড়া নগর ও তার আর্বান নাগরিকরা যখন জীবনের ঘাড়ে চেপে হা-হুতাশ করে বলছেন বড় বেরঙীন আজকাল, পাচ্ছেন না খুঁজে কাছাকাছি কোন রঙ- সেইকালে…একদল মৃত্তিকা-মানুষেরা (রণে)-বনে-জঙ্গলে প্রচণ্ড গর্জনে রাষ্ট্রের ঘন ঘন দামিনী-ভুজঙ্গ-ক্ষত যামিনী-রূপ আঘাতকে ত্যাজ্য করে চালিয়ে যাচ্ছিলো,যাচ্ছে নিজের যাপন-জমি-জীবন রক্ষার মৌলিক লড়াই। দেবী তাদের পাশে,সাথে মিশে ছিলেন।

Mahasweta Devi Portrait Session
PARIS, FRANCE – NOVEMBER 19: Indian writer Mahasweta Devi poses during a portrait session held on November 19, 2002 in Paris, France. (Photo by Ulf Andersen/Getty Images)

ভাবলে কিঞ্চিৎ ভ্রান্তিবিলাস হবে যে, মহাশ্বেতা দেবী শুধু ভারতের পশ্চিমবঙ্গ,বিহার,মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তীসগঢ় রাজ্যের আদিবাসীদের (বিশেষত লোধা ও শবর আদিবাসী) নিয়েই ব্যতিব্যস্ত ছিলেন। মহাশ্বেতা দেবীর আগ্রহ ও ভাবনার সীমানা ‘চাচা ঢাকা কতদূর’ এর চেয়েও সুদূরপ্রসারী ছিল,আছে। তিনি ভেবেছেন দ্রৌপদীকে নিয়ে,লাইলীকে নিয়ে,স্তন্যদায়িনীকে নিয়ে। ভেবেছেন পারিবারিক ঠগী সিলসিলা থেকে মুখ সরিয়ে নেয়া দূর্গতিনাশিনী মা ভবানীর ভক্ত কুন্দনকে নিয়ে,অসম সাহসী,হার না-মানা দৃঢ় মানসিক শক্তির অধিকারী ঝাঁসির রাণী লক্ষ্মীবাইকে নিয়ে, সময় নামক অতীতের পাখি ফিরিয়ে এনেছেন টেরোড্যাকটিল এর বয়ান বুননের মধ্যে দিয়ে। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে ফকির সাধুদের বিরূদ্ধে ইংরেজদের নৃশংসতা ও প্রতিরোধের কথাও তুলে ধরেছেন তার লেখায়। লৈখিক, লৌকিক ও মৌখিক ইতিহাস এবং মাঠ থেকে লোকমুখে ফেরা জীয়ন্ত গান-পুরাণ-গল্প সংগ্রহ করে, গবেষণা-পর্যেষণার ভেতর দিয়ে দেবী গড়ে তুলতেন কাহিনীর ইমারত।

তবে হ্যাঁ,তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত চলাফেরা ছিল আদিবাসীদের জগতে। তাই জন্য, মহাশ্বেতা তাদের কাছে লেখিকা/অধিকার কর্মী/এনজিও আপা হইতে পারেন নাই-হয়ে গেছিলেন মারাং দাই। মানে মা।

ছিলেন নন্দীগ্রাম আন্দোলনের নেতৃত্বে, একত্রিত করেছেন সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের বিতর্কিত জমি অধিগ্রহণ নীতির বিরূদ্ধে বহুসংখ্যক বুদ্ধিজীবী,শিল্পী,লেখক ও নাট্যকর্মীকে।

উন্নয়ন সংস্কৃতি নামক সন্ত্রাসের জোয়ারে পা চুবিয়ে বসে,আমরা যখন ছদ্ম-চিন্তার আয়াসে ভাবছি অর্থ উপার্জনের রাস্তা ধরিয়ে দিলেই একজন মানুষের উন্নতি ঘটে যায়/যাবে,তখন লেখালেখিকে জীবিকা হিসেবে নেয়া মহাশ্বেতা দেবী ভেবেছেন জীবনের সজীবতার কথা, ফেইক আধুনিক মানবিকতার বনসাই-কে সত্য মহীরূহে বেড়ে উঠতে দেখবার/দেবার উপায়। বিশ্বাস্যরকমের প্লাস্টিক হয়ে উঠার পায়তারা কষা মানুষদের সজোরে ধাক্কা মেরে মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন ভাবো, ভাবো- ভাবা প্র্যাক্টিস করো

mahasweta-devi-7591
Mahasweta Devi with C.S. Lakshmi / Indian Express

 

একজন সাহিত্যকর্মী হিসেবে তাঁর কাজ ছিল সর্বত্রপ্লাবী, মুদ্রিত অক্ষরমালা থেকে পর্দা কাহিনী জ্বলজ্বলে সে আগুন ছড়িয়ে আছে সবখানে।

এই রচনার বিধেয় (কর্মফলতঃ) মহাশ্বেতা দেবীর অর্জনসমূহ নিয়ে আলাপ করা, তা উদ্দেশ্য নয় মোটেও। উদ্দেশ্য বরং আরো সাদামাটা- তাঁর রচনার মাধ্যমগত রূপান্তরের মৌলিকতা অনুসন্ধান।

লেখা থেকে ছবি-তে রূপান্তর

সাহিত্যের সাথে সিনেমার সম্পর্ক দীর্ঘদিন। সিনেমা প্রযোজনা ব্যবসার শুরূ থেকেই ‘কাহিনী’ বা ‘গল্প’-কে অন্যতম কাঁচামাল হিসেবে গণ্য করা হয়। কাহিনী’র দরকার পড়ে এই কারণে যে,(ন্যারেটিভ বা আখ্যানমূলক) সিনেমায় চিত্রনাট্য বা স্ক্রিপ্ট চলমান চিত্রমালার মাস্তুলরূপে কাজ করে। গল্পের উৎস হিসেবে লেখ্য/কথ্য সাহিত্য বরাবরই বাড়ির কাছে আরশীনগরের দায় মিটিয়েছে। এর সপক্ষে আরেকটি প্রামাণ্য উদাহরণ হতে পারে- (কেন) বাংলাভাষী অঞ্চলে সিনেমাকে বই মনিকারে সম্বোধন করার রীতি। কারণ, সিনেমা বাণিজ্যের প্রারম্ভকালে সাহিত্য থেকে প্রচুর অ্যাডাপ্টেশন ঘটেছে পর্দায়। এখানে, আরেকটি ইস্যু ছিল মনের মুকুরে জন্ম নেওয়া চিত্রকল্পগুলো রক্ত-মাংসের আদলে দেখবার একটা ডিজ্যায়ার বা অভিলাষ সর্বদা কাজ করে সাহিত্যের ভোক্তাদের হৃদয়ে।

তার মানে এই নয় যে- প্রামাণ্য ঘটনা,জীবন বাজি রেখে অর্জিত অভিজ্ঞতা,ব্যক্তি(গত) দর্শন কাহিনীর চাহিদা মেটায় না…এইগুলোও নিবিড়ভাবে ব্যবহৃত হয়।

আমরা জেনে থাকবো লেখক,সাহিত্যিক,সমাজকর্মী,সমালোচক হিসেবে মহাশ্বেতা দেবীর লেখায় বারংবার উঠে এসেছে সমাজের সেইসব অসঙ্গতির আলাপ; যেগুলো তথাকথিত শিক্ষিত শ্রেণীর নেত্র কোণের অগ্রাহ্যসীমায় পড়ে থাকে। তথাপি, অগ্রাহ্যসীমায় পড়ে থাকা মানুষগুলোর কাঁধে জোয়াল রেখেই চলছে আধুনিকতার নামে মোনাফেকির গীতমালা।

এহেন বাস্তবতার ভবের বাজারে সংবেদনশীল সিনেমা মিস্ত্রীরা আগ্রহের সাথে আধার হিসেবে বেছে নিয়েছেন মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্যকর্ম তথা বাংলা সাহিত্য। তাঁর লেখা থেকে সিনেমা হয়েছে হিন্দী (সংঘর্ষ (১৯৬৮),রূদালি (১৯৯৩), গুড়িয়া  (১৯৯৭),হাজার চৌরাশি কা মা (১৯৯৮)), মারাঠি (মাটি মায় (২০০৭)), বাংলা-সাঁওতাল-ইংরেজি (গাঙ্গুর (২০০৭)) ভাষায়।

এর মধ্যে কল্পনা লাজমীর রূদালি (১৯৯৩),গোবিন্দ নিহালনির হাজার চৌরাশি কা মা  (১৯৯৮) বোধ হয় বহুল আলোচিত ও চর্চিত সিনেমা মানে মহাশ্বেতা দেবীর গল্প থেকে করা সিনেমা হিসেবে। তবে, খোদ বাংলা ভাষায় মহাশ্বেতা দেবীর গল্প সিনেমায় সাঙ্গীকরণ করতে লেগে যায় ১৯৯৮ সাল। এর আগে অবশ্য পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষী নির্মাতা গৌতম ঘোষ ১৯৯৭ সালে জ্ঞানপীঠ লেখিকার জনি ও উর্বশী গল্পের অবলম্বনে বলিওড ভাষায় তৈরি করেছিলেন গুড়িয়া। ১৯৯৮ থেকে ২০১৩ এর ভেতরে তরূণ মজুমদার (অরণ্যের অধিকার, ১৯৯৮),ঈশ্বর চক্রবর্তী (উল্লাস, ২০১২), উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায় (স্বভূমি,২০১৩) দেবীর রচনা পর্দাকাহিনীতে রূপান্তর করেন কিন্তু দর্শকমহলে এই সিনেমাগুলো কোন রোল তুলতে পারেনি।

১৯৬৮ সালে বোম্বের সিনেমা নির্মাতা হারনাম রাওয়ালি ঠিক করলেন মা কালীর কাল্ট ভক্ত ঠগীদের নিয়ে সিনেমা রচনা করবেন। সেই বেলা তাঁর নজর পড়ে দেবীর লায়লী আশমানের আয়না উপন্যাসটি। হারনাম রাওয়ালির প্রস্তাবে মহাশ্বেতা দেবীর প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ চমকপ্রদ। প্রতিক্রিয়াটা ছিল এমন-“আমি দিলীপকুমারের বিরাট ফ্যান। তাই প্রোডিউসার যখন বলল যে দিলীপকুমার অভিনয় করবেন,আমি আর কিচ্ছু না ভেবে হ্যাঁ বলে দিলাম। আমার হিরো আমার লেখা সিনেমায় অভিনয় করবেন,এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী-ই বা হতে পারে!”

রাওয়ালি আবরার আলভির হাতে সঁপে দেন চিত্রনাট্যের ভার। আবরার আলভি ততদিনে আর-পার (১৯৫৪),কাগজ কে ফুল (১৯৫৯),সাহেব বিবি অউর গোলাম (১৯৬২) এর মতন সিনেমার চিত্রনাট্য,সংলাপ লেখার ক্রেডিট পকেটস্থ করেছেন। তাঁর লেখা চিত্রনাট্যের চরিত্রদিগের জবানে সংলাপ বসিয়েছিলেন তরূণ কবি,গীতিকার গুলজার।

গুলজার এখনো দিবালোকের মত স্পষ্ট মনে করতে পারেন সেই সময়ের কথা:“আমি যখন প্রথম এই কাজটি করতে শুরু করি,আমার মনে হয়েছিল গল্পটি একেবারে গুপ্তধন আবিষ্কার। এই লেখকের ফ্যান আমি অনেক দিন ধরেই,কারণ হিন্দিতে তখন ওঁর অনেক গল্পই অনূদিত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এই গল্প আমায় যেন বিমুগ্ধ করে দিল।…”

maxresdefault-2

প্রকাশ থাকুক, তৎকালে পর্দার জনপ্রিয় জোড়া দিলিপ কুমার ও বৈজয়ন্তিমালা এর এটি ছিল শেষ প্রকল্প। এরপর আর তাদের একলগে পর্দায় পাওয়া যায় নাই। সিনেমার সুর ও সঙ্গীত আয়োজনে ছিলেন নৌশাদ।

সিনেমাটা ব্যবসায়িক অর্থে মুনাফা ঘরে তুলতে পারে নাই। তবে, ক্ল্যাসিক সিনেমা হিসেবে সিনেমাবেত্তা ও রসিকদের ক্যাটালগে স্থান করে নিয়েছে অনায়াসে।

তত্ত্ব-এর বাজার

প্রতিনিয়ত মহামতি ডারউইনের সারভাইভ্যাল দ্য ফিটেস্ট এর প্রমাণ রাখতে অভিযোজন এবং গ্রহণ (অ্যাডাপ্টেশন ও অ্যাডোপশন) চক্রের আয়ু বহাল রয়েছে। এভাবেই কখনো বাস্তবতাকে অবলম্বন করে আবার কখনোবা সাহিত্যকে অবধারণ করে সিনেমা নির্মিত হয়ে থাকে। স্বভাবতই, সিনেমা অধ্যয়ন বিদ্যার একটি ধারা হচ্ছে সাহিত্য ও সিনেমা অ্যাডাপ্টেশন তত্ত্ব। এই তত্ত্বের আলোকে সাহিত্য হচ্ছে উৎস টেক্সট এবং সিনেমা টার্গেট টেক্সট। এই তত্ত্ব আরো খতিয়ে দেখে যে, উৎস থেকে লক্ষ্যে পৌঁছানোর ঝর্ণাধারার কোন কোন বিন্দুতে সিনেমা সাহিত্য থেকে বি-চ্যুত হয়েছে এবং কীভাবে হয়েছে। এটি আরও দেখতে চায় যে, আলো দিয়ে আঁকা সিনেমা নাম্নী চিত্রপটে উৎস টেক্সটের কোন ঘটনা/চরিত্র বাদ পড়েছে বা যুক্ত করেছে কিনা। একটি উত্তম অ্যাডাপ্টেশনে মূলতঃ নজর রাখা হয় সেটি সাহিত্যিক টেক্সটের স্তরায়িত জটিল বুননকে পর্দায় ধারণ করার প্রশ্নে মূল টেক্সটের স্পিরিটকে প্রতিফিলিত করতে পেরেছে কিনা- সেদিকটির প্রতি। এই শর্তাধীন পরিস্থিতির আবহে উভয় টেক্সটের মধ্যকার ট্রান্সটেক্সচুয়াল দশাটিকে ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। স্মর্তব্য যে, শুধু সাহিত্য থেকেই সিনেমা আত্তীকরণ হয়ে থাকে না, পরিস্থিতি বিশেষে সিনেমা থেকেও সাহিত্য পয়দা করার নমুনা বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে।

অ্যাডাপ্টেশন তত্ত্ব যখন ন্যারেটোলজির মানস সরোবরে কেলিরত হয়, তখন সেটি অন্তর্দৃষ্টি সমেত পর্দায় প্রস্ফুটিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের কারনামা আমাদের সামনে উপস্থাপন করে। ন্যারেটোলজি আখ্যান বা ন্যারেটিভের গঠন, স্বাভাবিক ক্রিয়া, থিম, রীতিপ্রথা ও প্রতীকরাজি নিয়ে নাড়াচাড়া করে। যেসব উপায়ে ন্যারেটিভ ও ন্যারেটিভের গাঁথন,গঠন মানুষের উপলব্ধি বা বেদন কে প্রভাবিত করে সেই ইস্যুগুলো ন্যারেটোলজি বিচার ও বিবেচনা করে থাকে।

টেক্সট বা পাঠকৃতি প্রায় সর্বদাই চরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা শাসিত। চরিত্রের নজর দিয়ে আমরা অর্থাৎ পাঠিকা-পাঠক-দর্শকবৃন্দ ঐ দুনিয়া ভ্রমিয়া থাকি। মতি-সমীক্ষণ তত্ত্ব দ্বারা সাহিত্যের পাতায় বা সিনেমার পর্দায় অঙ্কিত চিত্রকল্পগুলো ভেঙেচুড়ে এর অন্তর্নিহিত গূঢ় অর্থ শুলুক সন্ধান করার একটি রাস্তা তৈরি হয়।

এক্ষণ, তত্ত্ব বিষয়ক এই নাতিদীর্ঘ ওয়াজ শেষে আমরা আবার ফিরে তাকাতে চাই মহাশ্বেতা দেবীর লায়লী আশমানের আয়না এবং হারনাম রাওয়ালির সংঘর্ষ (১৯৬৮) এর পানে। তত্ত্বের ঘেরাটোপে থেকে আমরা তদন্ত করে দেখবো রাওয়ালি কোন চোখে উপন্যাসটি পাঠ করেছেন এবং কাল বা সময়ের কারিকুরি অংকনের প্রশ্নে কী ধরনের ট্রিটমেন্ট দিয়েছেন।

লায়লী আশমানের আয়নাসংঘর্ষ (১৯৬৮)

ফিল্মিক বা সিনেম্যাটিক টেক্সটের রচনা প্রক্রিয়ার ভেতরে অ্যাডাপ্টেশন বা অভিযোজনের চরিত্রটি ঘনীভুত রয়েছে, কেননা ফিল্মিক বা সিনেম্যাটিক টেক্সট লেখনের নিজস্ব (কোন) রীতি নেই। বরং এটি প্রচলিত আখ্যান লেখনরীতি ধার করেই লেখালেখির কাজটুকুন সমাধা করে।

লায়লী আশমানের আয়না এবং সংঘর্ষ (১৯৬৮)-এর মধ্যে ট্রান্সটেক্সচুয়ালিটি বিদ্যমান। ট্রান্সটেক্সচুয়ালিটি নির্দেশ করে টেক্সটের পাঠগত উৎকর্ষ। অর্থাৎ, এটি এমন এক নিরিখ যা দিয়ে একটি টেক্সট প্রকাশ্যে অথবা গোপনে অন্য যেসকল টেক্সটের সাথে সম্পর্কিত, সবগুলোকে এক লাইনে দাঁড় করানো যায়। এতদ্বারা উপলব্ধি করা সম্ভব যে, কোন টেক্সট এর একমাত্র উদ্ভাবক বলে কিছু নাই-বরং এটি ভূত থেকে ভূতে অভিযোজিত হয় কাল ও স্থানের নিত্যতার মাধ্যমে।

 

ট্রান্সটেক্সচুয়ালিটি ধারণাটির প্রস্তাবক জেরার্ড জেনেট। তিনি মিখাইল বাখতিনের ক্রোনোটোপ ও জুলিয়া ক্রিস্তেভার ইন্টারটেক্সচুয়ালিটি-কে সমন্বয়ের মাধ্যমে এই ধারণা পেশ করেন। যেটি চরিত্রগতভাবে পরিবেষ্টক বা সর্বব্যাপী।

এখন, ট্রান্সটেক্সচুয়াল লেন্স দিয়ে যদি লায়লী আশমানের আয়না এবং সংঘর্ষ (১৯৬৮)-কে পর্যবেক্ষণ করা হয়, তবে আমরা যা দেখতে পাবো-

ইন্টারটেক্সচুয়ালিটি

ইন্টারটেক্সচুয়ালিটি বুঝায় টার্গেট টেক্সট ও উৎস টেক্সট এর কার্যকর সমবায় উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে কোন (উদ্ধৃতি, কুম্ভীলকবৃত্তি,বা ইশারা) আকারে।

বিশ শতকের ষাটের দশকে লেখা করা লায়লী আশমানের আয়না এই তাত্ত্বিক আলোচনায় উৎস টেক্সট এবং সংঘর্ষ (১৯৬৮) টার্গেট টেক্সট। তো, দেবীর লায়লী আশমানের আয়না  এর চরিত্ররা বারানসি ও কলকাতাকে কেন্দ্র করে কাশী,গাজীপুর,মির্জাপুর সহ নানান স্থানে চলাফেরা করে।

আর সংঘর্ষ  (১৯৬৮) এ ঘটতে দেখবো যাবতীয় ঘটনা কাশী/বারানসিতে ঘটে যেতে, চরিত্রদের পরিচয়/গতিবিধিও উৎস টেক্সট অনুসারী নয়। অ্যাডোপ্টেশনের ক্ষেত্রে বরাবরই চিত্রলেখকের সুযোগ থাকে হুবহু মূল ঘটনাকে অনুসরণ না করে বা করে চিত্রনাট্যের গাঁথুনি নির্মাণের। যেমন জাপানি সিনেমা কারিগর আকিরা কুরোশাওয়া যখন সাহিত্য থেকে চিত্রনাট্য করতেন তখন চলচ্চিত্রের প্রয়োজনে সাহিত্যকে পালটে নেবার ব্যাপারে সচেতন থাকতেন। তাঁর মতে চরিত্রগুলির কায়া এবং সিনেমাটির আঙ্গিক উদ্ভূত হয় লেখনীর মধ্য দিয়েই।

এই প্রেক্ষাপট থেকে পরখ করলে পাঠিকা-পাঠক-দর্শক দেখতে পারবেন যে, লায়লী আশমানের আয়না য় যেখানে স্তরায়িত বাস্তবতা, ঘটনার সংশ্লেষ, প্রান্তিক থেকে কেন্দ্রীয় সকল কাল্পনিক চরিত্রদের বিকাশ ঘটেছে; সেথায় সংঘর্ষ  (১৯৬৮) এ ঘটনা ঘটেছে অনেককাংশে (সরল)রৈখিক বয়ানের গড়নের ভেতর দিয়ে। তবে তা, ক্লান্তিকর কোন মোড়কে ঘটে নাই।

এক্ষণ, সাহিত্য থেকে সিনেমায় অভিযোজনের বেলায় বেশিরভাগক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় আমারা শুনে থাকবো- “সিনেমাটা লিটারেচারের প্রতি জাস্টিস করতে পারে নাই। বইয়ে যা আছে কিচ্ছু আসে নাই সিনেমায়”। এই বক্তব্যের মূলে উৎস টেক্সটের প্রতি একধরনের পক্ষপাত বা অন্ধবিশ্বাস কাজ করে থাকে। এই অভিযোগের তীর সংঘর্ষ  (১৯৬৮) এর পানেও ছোঁড়া সম্ভব, যে কোনও সাহিত্য(অন্ধ)ভক্তের প্রেক্ষিত থেকে। কেননা, মূলের প্রতি অনুগত আদতে থাকেন নাই সিনেমার চিত্রনাট্যকার আবরার আলভি বা গুলজার। মূল টেক্সট থেকে চরিত্রদের নাম-ধাম-পরিচয়কে অবলম্বন করে তারা রচনা করেছেন লায়লী আশমানের আয়না এর অন্যতর বয়ান। এই বয়ান রচনা করার এখতিয়ার বা অ(ন)ধিকারের প্রশ্নটা যতখানি না উদ্দেশ্যমূলক তারও অধিক বোধহয় নৈতিক। এ বিন্দুর ফয়সালায় স্মরণ করা যেতে পারে জনাব ডারউইনের বিবর্তনবাদ নকশার অন্যতম ইস্যু অভিযোজন; টিকে থাকার শর্ত। সেহেতু, টার্গেট টেক্সটে মূল টেক্সটের এহেন অভিযোজিত রূপ_আসলে মূল সত্ত্বাটির টিকে যাওয়া বর্তমানতাকে নির্দেশ করে।

নির্মাতা হারনাম রাওয়ালি অ্যাডাপ্টেশনের বেলায় ঘটনা বা গল্পের চাকা ঘোরানোর  রিমোট কন্ট্রোল হিসেবে বাছাই করেছেন ঠগীদের জীবন, বারবিলাসিনী নারীর মোহমায়া, বংশগত বিরোধ ও প্রতিহিংসা। গাঠনিক অর্থে এই সবকটি উপাদান মূল টেক্সটের জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু, পর্দায় তাদের অ্যাকশনের খোলনলচে পালটে দিয়েছেন নির্মাতা।

sunghursh-original-motion-picture-soundtrack-various-artists-1968-rawmusic-in

ফলতঃ বইয়ের পাতায় যা একজন ঠগী জীবন বিমুখ, ভালোবাসা কাতর কুন্দনের ফেরারী স্মৃতির আখ্যান; সেটি পর্দায় পরিণত হয় গৃহবিবাদ আর প্রতিহিংসার আখ্যানে। এই প্রসঙ্গে লিও তলস্তয়ের একটি লাইন স্মরণ করা যেতে পারে; তাঁর দৃষ্টিতে ফিল্ম বা সিনেমা “সাহিত্য কলা বা লিটারারি আর্টের প্রাচীন পদ্ধতির প্রতি এক (প্রকার) সরাসরি আক্রমন ”। অর্থাৎ, মূল টেক্সটের প্রতি অনুগত থাকা, মূল টেক্সটের ভাষ্য বিক্ষত না করার প্রশ্নে যে পৌরুষিক, পিতৃতান্ত্রিক অবস্থান তাকেই নির্দেশ করেছেন তলস্তয়। আর, হারনাম রাওয়ালি মূলের প্রতি বিশ্বস্ত না থাকার মধ্যে দিয়ে বরং পাঠক-দর্শকের মানসে উৎস টেক্সটের প্রভাবজনিত উদ্বেগকে আরো চাগিয়ে দিয়েছেন। ফ্রয়েডিয় ঐকিক  নিয়ম মতে এথায় সংঘর্ষ (১৯৬৮) এক ঈদিপাস সন্তান যে প্রতীকী অর্থে তার পিতা অর্থাৎ লায়লী আশমানের আয়নাকে বধ করেছে।

এতে করে, সিনেমাটি সাহিত্যের ছায়া অবলম্বনের ভেতরে দিয়ে, একটি টেক্সচুয়ালাইজড ইমেজের দুনিয়াতে সওয়ার হয়ে এবং আদিখ্যেতার মাধ্যমে নিজেই একটি টেক্সট হয়ে উঠে। তদুপুরি, বিস্তীর্ণ বয়ানের জগতে ধারাবাহিকতার খন্ডে অঙ্গীভুত হয়।

প্যারাটেক্সচুয়ালিটি

টেক্সটকে ঘিরে আরো যেসব বার্তা ও ভাষ্য কিলিবিল করে,সেসবগুলোকে প্যারাটেক্সচুয়ায়লিটি নির্দেশ করে থাকে। প্যারাটেক্সটের অধিক বাস্তবমুখী ভূমিকা থাকে; এটি পাঠিকা-পাঠক-দর্শককে টেক্সটের প্রসঙ্গ বা পূর্বাপর সমন্ধ অনুধাবনে পথ দেখিয়ে থাকে। যা দ্বারা গ্রাহক বা ভোক্তা আন্দাজ করতে পারে টেক্সটটি কবে প্রকাশিত হয়েছে, কে প্রকাশ করেছে, কী উদ্দেশ্যে করেছে এবং কিভাবে নির্দিষ্ট টেক্সটটি পাঠ করা উচিত বা অনুচিত।

এইক্ষেত্রে, (টার্গেট) টেক্সট হচ্ছে সংঘর্ষ (১৯৬৮)। প্যারাটেক্সটের ধারণা অনুযায়ী এই সিনেমাকে কেন্দ্র করে যা যা উৎপাদিত হয়েছে, যেমন- সিনেমার শিরোনাম, পোস্টার, লিফলেট, মুক্তির আগে প্রচারিত গান, পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবর/সমালোচনা, নির্মাতা/কলাকুশলীদের সাক্ষাৎকার…এসবই সংঘর্ষ (১৯৬৮) এর প্যারাটেক্সট। সিনেমা মুক্তির আগে ও পরে ব্যবহৃত এই প্যারাটেক্সটগুলো দর্শককে তৈরি করেছে সংঘর্ষ (১৯৬৮) সম্পর্কে।

শিরোনাম হিসেবে সংঘর্ষ  শব্দটি দ্যোতিত করে এক অশনি সঙ্কেত এবং চাপা উত্তেজনা। কিন্তু, মূল টেক্সটের শিরোনাম থেকে প্যারাটেক্সচুয়ালি যেমন ধারণা করা যায় একজন নারীর জীবন আলেখ্য আছে বয়ানে, সেটি টার্গেট টেক্সটে হাজির নেই।

sunghursh_091613033846

সংঘর্ষ (১৯৬৮) এর পোস্টার থেকে ধারণা করা যায় এই সিনেমাটির কেন্দ্রীয় চরিত্র দুইজন দীলিপ কুমার এবং বৈজয়ন্তিমালা। যারা তৎকালীন ইন্ডাস্ট্রির সুপারস্টার তথা এটি তারকাখচিত সিনেমা। এটি যে আনন্দঘন আখ্যানের সিনেমা নয় সেটিও বোঝা যায় পোস্টারে ব্যবহৃত অনুজ্জ্বল, ধূসর রঙয়ের দ্বারা।

সিনেমার সুর আয়োজনে ছিলেন প্রখ্যাত নৌশাদ এবং কন্ঠ দিয়েছিলেন লতা মুঙ্গেশকর, আশা ভোসলে এবং মোহম্মদ রফি। এই তথ্যটি প্রচার করছে যে, এই সিনেমায় দারূণ গান আছে। যা এক অর্থে সিনেমা দেখার জন্য দর্শককে প্রস্তুত করেছে, সিনেমার ধরন/ধারণ সম্পর্কে বার্তা ছড়িয়েছে।

পত্রিকায় আলোচিত সিনেমাটির সংবাদ একইভাবে প্রভাব ফেলে দর্শকবৃন্দের মনোজগতে। নিজের সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পূর্বেই পরিবেশিত সংবাদ্গুলো সিনেমাটির সম্পর্কে একটি কর্তৃত্বশীল বোঝাপড়া তৈরি করে।

বর্তমান নয়া মিডিয়ার যুগে প্যারাটেক্সটের রকমের আকস্মিক বিস্ফোরণ ঘটেছে বলা যায়। অনলাইনে সিনেমার ছবি, পোস্টার, রিভ্যিয়ু, ভিডিও এবং ডিভিডি সংস্করণ…এখন উন্মোচন করেছে এক নতুন পণ্য বাস্তবতার। সংঘর্ষ (১৯৬৮) এই বাস্তবতার বাইরে নয়। মুক্তির প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও এই সিনেমা বাজারে আছে, গৃহে ব্যবহারের জন্য ডিভিডি আকারে খরিদ করা যাচ্ছে। এবং ডিভিডি মোড়কে, পিছে লিখে রাখা মোটামুটি বিবরণ- প্যারাটেক্সটরূপে দর্শককে টেক্সটের ভেতরে প্রবেশের আগেই তৈরি করছে আসন্ন অভিজ্ঞতা অ্যাডোপ্ট করার জন্য।

হাইপারটেক্সচুয়ালিটি

লায়লী আশমানের আয়না এবং সংঘর্ষ (১৯৬৮) তথা উৎস টেক্সট আর টার্গেট টেক্সটের মধ্যকার লেনদেনের সম্পর্ক নির্দেশ করে হাইপারটেক্সচুয়ালিটি। যেটি টার্গেট টেক্সট তাকে বলা হয় হাইপারটেক্সট। উৎস টেক্সটকে বলা হয় হাইপোটেক্সট। ট্রান্সটেক্সচুয়ালিটির এই মাত্রা দ্বারা গেনেট বোঝাতে চেয়েছেন অ্যাডাপ্টেশন প্রক্রিয়ায় হাইপারটেক্সটি হাইপোটেক্সটের রূপান্তর, পরিমিতি, বিশদীকৃত বা সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে কিনা। হাইপারটেক্সটে কখনোই মূল টেক্সটের “ভাষ্য” শৈলী বজায় থাকবে না।

এই প্রেক্ষিত থেকে, সংঘর্ষ (১৯৬৮) এখানে হাইপারটেক্সট। এটি প্রকাশিত যে- হাইপারটেক্সট রূপে সংঘর্ষ (১৯৬৮), হাইপোটেক্সট লায়লী আশমানের আয়না এর আখ্যান, ভাষ্য, শৈলীকে রূপান্তর করে একটি নতুন আখ্যানের পয়দা করেছে। হাইপারটেক্সচুয়ালি অ্যাডাপ্টেশনের ক্ষণে সংঘর্ষ (১৯৬৮)-এ একটি দ্বৈত চরিত্রের সংযোজন ঘটেছে। যেটি হাইপোটেক্সটে গরহাজির ছিল। যেমন- বজরঙ্গী চরিত্রটি কুন্দনের সহযোগী। কিন্তু, সিনেমায় ঘটনার লীলা খেলায় কুন্দন-ই বজরঙ্গী হয়ে আবির্ভূত হয়। একই রকমের ট্রিটমেন্ট লক্ষ্য করা যায় মুন্নী ওর্ফে লায়লী এর বেলাতেও। হাইপোটেক্সটে প্রোটাগনিস্ট যুবক কুন্দনের সাথে পরিচয় ঘটে বিখ্যাত বারবিলাসিনী লায়লীর। শৈশবে কোনভাবেই তারা পরিচিত ছিল না। সিনেমায় বিষয়টিকে উলটো করে দেখানো হয়েছে এক অর্থে।

10706429_bollywoods-ms-twinkle-toes_tcad95965

সিনেমা হিসেবে তথা হাইপারটেক্সটের জায়গা থেকে নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকারবৃন্দের (হয়তোবা) তাড়না থেকে থাকতে পারে একটি আদর্শ পরিবারের মডেলের ভেতর দিয়ে লায়লী আশমানের আয়না বা হাইপোটেক্সটকে ধারণ করার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। হাইপোটেক্সট হিসেবে উপন্যাসটি বেশ চ্যালেঞ্জিং এবং সমাজরীতিঅনীহ একটি মাত্রা নিয়ে এগিয়েছে; সে তুলনায় হাইপারটেক্সট অনেকখানি কনফর্মিস্টের মত কাহিনীটিকে মঞ্চায়ন করেছে।

এখানে, সিনেমার ব্যবসায়িক স্বার্থ একটা ভূমিকা রেখে থাকতে পারে। যদিও, ব্যবসায়িকভাবে এটি আর্থিক সফলতা পায় নাই। কিন্তু, ক্ল্যাসিক হিসেবে ইন্ডিয়ান হিন্দী সিনেমার তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। গানের প্রশ্নেও হাইপারটেক্সটে হাইপোটেক্সটের কোন রেফারেন্স নেই। হাইপোটেক্সটে লঁগতা নহী জীয়া মোরা  শিরোনামের একটি ধ্রূপদ সঙ্গীত বারবার ফিরে এসেছে বিভিন্ন বিষাদ মাখা পরিস্থিতিতে। হাইপারটেক্সট বা সিনেমায় তাঁর কোন প্রয়োগ নেই।

যেহেতু, সংঘর্ষ (১৯৬৮) নির্মাণ প্রক্রিয়ায় মূল টেক্সটের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার কোন ঈশপীয় দায় ছিল না, সেহেতু হাইপোটেক্সট এর সিনেমাটিক অ্যাডাপ্টেশন তথা সংঘর্ষ (১৯৬৮) এ এমন অসংখ্য উদ্বেগ বিন্দু খুঁজে পাওয়া সম্ভব/যাবে।

পরিশেষ

মহাশ্বতা দেবীর লায়লী আশমানের আয়না পড়তে বসে একপর্যায় মনে হতে শুরু করে এটি উপন্যাস নয় বরং ওং কার ওয়াইয়ের কোন সিনেমা চলছে বইয়ের পাতায়। দেবী মুন্সিয়ানার সাথে স্নেহপিয়াসী, নিঃসঙ্গ এক মানুষের গল্প বুনে গেছেন প্রেমের রঙ্গে, থ্রিলার গল্পের উত্তেজনায়। এর মধ্যে প্রয়োজনে কখনো ফ্ল্যাশব্যাক যেমন ব্যবহার করেছেন, তেমনি ফ্ল্যাশ ফরোয়ার্ডেও গেছেন। ঘটনার বাতাবরণের ভেতর দিয়ে তিনটি নিঃসঙ্গ, আত্ম অভিমানী চরিত্রকে বসিয়েছেন এক ছাদের নীচে।

অপর পাশে, সংঘর্ষ (১৯৬৮) প্রচলিত হিন্দী সিনেমার কায়দায় উপন্যাসের ঠগী অংশটুকুনকে সামনে এনে ঘাত-প্রতিঘাত, হিংসা-প্রতিহিংসার কামনা-বাসনা ব্যবহার করে একটি রমরমা সিনেমার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে চেয়েছিলো হয়তো। সে পরিকল্পনা হালে জল পায়নি। তবে, ট্রিটমেন্টের প্রশ্নে কুন্দনকে বজরঙ্গীর পরিচয়ে সিনেমার অন্তে পরিচিত করার ভেতর দিয়ে মূল টেক্সটের অন্যতর প্রযোজনা হাজির করেন।

অ্যাডাপ্টেশন শিল্পের সহজাত ধর্ম। মানুষ আলসেমি বা ইগোর কারণে ব্যাকফুটে গেলেও,প্রকৃতি তার অমোঘ ঘোরে অ্যাডাপ্টেশনের চাকা সচল রেখেছে।

সাহিত্য ও সিনেমা উভয়ই জায়মান আখ্যান-বাস্তবতার দুনিয়ায় জেগে উঠা চর। এই দুই চরের প্রাকরণিক সাদৃশ্য যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে এর মাধ্যমগত তফাৎ। তবে,এই সাদৃশ্য ও তফাতএর দ্যুলোক ভেদ করে উভয়ের মধ্যে অংশীদার হয়ে দাঁড়ায় চিত্রকল্প বা ইমেজারি। কেননা, মানসলোকে হোক বা অক্ষির সম্মুখে সঞ্চলনশীল হোক আখ্যান আমাদের সম্মোহিত করে থাকবে চিত্রকল্পের ইন্দ্রজাল দিয়ে।

সাহিত্য ও সিনেমার পারস্পারিক অ্যাডাপ্টেশনের ক্ষেত্রে সিনেমা অধ্যয়ন চর্চা বেশ ভাবিত নয় মূলের প্রতি বিশ্বস্তার ইস্যুতে। বরং,এই জ্ঞান শাখা খুঁজে দেখতে চায় এই অনন্ত অভিযোজনের চক্করে সাহিত্যিক টেক্সট ও সিনেম্যাটিক টেক্সটের মধ্যে নতুন কোন শক্তির স্ফুরণ ঘটছে কিনা,নতুন কোন অধিবিচার তৈরি হচ্ছে কিনা অথবা ভিন্ন কোন পঠন সৃষ্টি হচ্ছে কিনা। যার ভেতর দিয়ে মূলতঃ ভিন্ন (শিল্প)মাধ্যমের আন্তঃদূরত্ব এবং ভাবনা প্রকাশের উপকরণসমূহের নৈকট্য সাধিত হবে।

তামাম শুদ!

দোহাই

Bluestoens, G.(1967).Novels Into Film: The Metamorphosis of Fiction into Cinema. California: University of California Press,

Butler, C. (2003). Structure and function: From clause to discourse and beyond. Amsterdam: John Benjamins.

Genette, G.(1992).The architext: an introduction. Berkeley: University of California Press

Kumar, A. (2009).Blast from the Past: Sunghursh (1968). The Hindu. Retrieved 26 September 2016

Nöth, W. (1990).Handbook of semiotics. Bloomington: Indiana University Press.

Sunghursh (1968). [DVD] India: Harnam Singh Rawail

গুলজার (৮ নভেম্বর,২০১৫).তাঁর পাতায় পাতায় গুপ্তধন.আনন্দবাজার পত্রিকা. Retrieved 26 September 2016

ফিরদাউস, ই.(২০১৩).আকিরা কুরোশাওয়া বলতে আছেন একজনা. শিল্প ও শিল্পী,আবুল হাসনাত (সম্পা.) ঢাকা: আইস মিডিয়া লিমিটেড

দেবী, ম.(?).লায়লী আশমানের আয়না. কলকাতা

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s