মুক্তদৈর্ঘ্যের সন্ধানে- ইমরান ফিরদাউস

১৯৮৮ সনে  বাংলাদেশ তো বটেই ইন্ডিয়ান উপমহাদেশে সর্বপ্রথম আয়োজিত হয় আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব। আয়োজক ছিলো বাংলাদেশ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মঞ্চ, ইংরেজিতে দাঁড়ায় বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম। এই মঞ্চ এখনো বর্তমান আছে এবং ক্রিয়াকর্মের হাজিরার ধারায় নিয়মিতভাবে আয়োজন করে যাচ্ছে উৎসবটি। প্রথম সংস্করণে (শিরোনামে) যা ছিল আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব, সেটি সপ্তম সংস্করণে পরিবর্তিত হয়।

আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মুক্ত চলচ্চিত্র এর ধারণাটি উৎসবে যুক্ত হয় সপ্তম সংস্করণে ২০০১ সনে। এর মাঝে আবার পঞ্চম সংস্করণের শিরোনামে একটি স্বল্পস্থায়ী পরিবর্তন দেখা যায় বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র ধারণাটি যোগ করার মাধ্যমে, সেটি ছিল ১৯৯৭ সন। পরবর্তী সংস্করণের প্রাচীরপত্র বা পোস্টারে এই ধারণাটি গরহাজির রয়ে যায়। মূলত সপ্তম সংস্করণ থেকে উৎসবটি পরিচিত হয়ে আসছে স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র পার্বণ হিসেবে।

তো, এই তথ্যরাজি উপস্থাপনের বিধেয় হলো আয়োজক পক্ষ এবার উৎসবের পাশাপাশি সংগঠনটির ত্রিশ বছর পূর্তি পালন করেছে। অতি সংক্ষেপে এ থেকে ধারণা করা যায়- বাস্তবতার পথচলায় ফোরামের নিজস্ব বোঝাপড়ার বিবিধ বুদ্ধিগত ও দার্শনিক বাঁকসমূহ।

চৌদ্দতম সংস্করণ উৎসর্গ করা হয় উপমাহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্রকার হীরালাল সেন ও সদ্য প্রয়াত বিশিষ্ট সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হককে।

opening by Abid Mallick
সৌজন্য- আবিদ মল্লিক

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বর্ষীয়ান চলচ্চিত্রকার, চিত্রগ্রাহক আফজাল এইচ চৌধুরীকে হীরালাল সেন আজীবন সম্মাননা পদক প্রদান করা হয়।  ষাট বছরের চিত্র-কর্মজীবনে বাংলাদেশ চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান ব্যাপক, যেমন- জহির রাহয়ান পরিচালিত পাকিস্তানের প্রথম রঙ্গিন ছবি সঙ্গম(১৯৬৪)- এর চিত্রগ্রাহকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রধান অতিথি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত এমপি ভবিষ্যতে এই উৎসব বৃহৎ পরিসরে আয়োজিত হবে এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এর বক্তব্যে উঠে আসে চলচ্চিত্র মাধ্যমের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রসঙ্গ, তাঁর মতে- চলচ্চিত্রের দুইটি ভূমিকা আছে একটি এর বিনোদনের দিক আরেকটি গণমানুষকে আন্দোলিত করতে পারার দিক। তাই, তিনি সমসাময়িক বাস্তবতাকে বিষয়বস্তু করে চলচ্চিত্র নির্মাণে এগিয়ে আসতে নির্মাতাদের অনুরোধ করেন।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে ফিল্ম সেন্টার স্থাপন, চলচ্চিত্র অনুদান সংখ্যা বৃদ্ধি এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের বিকাশে টেলিভিশনে প্রচারের ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তাব পেশ করা হয় সরকারের কাছে।

আট দিন ব্যাপী বয়ে চলা এই উৎসবে যোগ দেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত নির্মাতা, সমালোচকবৃন্দ। আগত অতিথিদের মাঝে অন্যতম চীনের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ও শিক্ষক অধ্যাপক শি ফী। তিনি বেইজিং ফিল্ম একাডেমির ভাইস-প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘদিন।

Professor Xie Fie by Abid Mallick

সৌজন্য- আবিদ মল্লিক

তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র পুরষ্কৃত হয়েছে বার্লিন ও মন্ট্রিয়েল চলচ্চিত্র উৎসবে, প্রায় পঞ্চাশ বছরের অধ্যাপনা জীবনে ফিল্ম পড়িয়েছেন চ্যান কাইগে, ঝ্যাং ইয়ামু প্রমুখ নন্দিত চিত্রনির্মাতাদের। শি ফী উৎসবের আলমগীর কবির স্মারক বক্তৃতা প্রদান করেন। স্মারক বক্তব্যে গণচীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবকালীন পরিস্থিতি ও পরবর্তী সাত প্রজন্মের নির্মাতাদের শিল্প প্রবণতা সম্পর্কে বিশদ বক্তব্য তুলে ধরেন। তাঁর নির্মিত দুইটি চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয় এবারের উৎসবে।

১৩ তম সংস্করণ থেকে যুক্ত হয়েছে মাস্টার ক্লাস পর্বটি। এবার দুইটি মাস্টার ক্লাস এর আয়োজন করা হয়। নির্বাচিত বক্তার ভূমিকায় ছিলেন মনিপুর স্টেটস ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট এর ডিন ও প্রামাণ্যচিত্রকার নীলোৎপল মজুমদার এবং ইন্দোনেশিয়ার বিকল্পধারার চলচ্চিত্রকার গ্যারিন নুগ্রহ।

নীলোৎপল মজুমদার তাঁর অধিবেশনে বর্তমান সময়ে স্বাধীনধারার প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতাদের পুঁজির যোগান এবং বিকল্প প্রদর্শন ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত আলাপ উত্থাপন করেন। মজুমদার লম্বা সময় ধরে কাজ করছেন প্রামাণ্যচিত্র মাধ্যম নিয়ে। কর্পোরেট পুঁজি থেকে গা বাঁচিয়ে, বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থার অর্থ লগ্নি এড়িয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের রাস্তার হদিশ রেখে যান তাঁর কথামালায়। তিনি নির্মাতাদের আরো কৌশলী ও দূরদর্শী হবার এবং কোন একটি বিষয়কে দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করতঃ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে এগিয়ে আসার পরামর্শ দেন।

গ্যারিন নুগ্রহ দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর ধরে জড়িত আছেন চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজন প্রক্রিয়ার সাথে। নির্ধারিত অধিবেশনে বিকল্পধারার স্বাধীন নির্মাতা হিসেবে একজন চলচ্চিত্রকারের করণীয় ইস্যুগুলোর উপর আলোকপাত করেন। তাঁর মতে-সিনেমা মানে শুধু শব্দ আর ছবির মেলবন্ধন নয়, নয় শুধু তিন অংকের দৃশ্য পরিকল্পনা। বরং এখানে যুক্ত হতে পারে গান, থিয়েটার, পারফরমিং আর্ট, নৃত্য; এর সাথে জুড়তে হবে আত্মবোধকে একজন ধ্যানীর মত করে। গ্যারিনের ভাষ্যমতে, গল্পের জন্য অনেক দূরে যেতে হয় না, গল্প লুটিয়ে আছে/থাকে পায়ের কাছে। তাঁর প্রস্তাবনায় প্রতিটি নির্মাতাই নিজেকে একজন কৃষকরূপে ভাবতে পারে। তাতে, সুযোগ ঘটবে প্রকৃতির সাথে সুন্দর একটি সম্পর্ক রচনার। আর নিজের মাঝে যদি প্রকৃতিকে ধারণ করা না যায়, তবে ভাগ-দৌড়ের এই কালে শিল্প-সত্ত্বা বিকাশের পথ রুদ্ধ হয়ে যেতেও পারে।

setan-jawa
গ্যারিন নুগ্রহের সেতান জাওয়া সিনেমার একটি মূহুর্ত

রেট্রোস্পেকটিভ অধিবেশনে এই নির্মাতার সাম্প্রতিক কালে নির্মিত ছয়টি সিনেমা প্রদর্শিত হয়। এই চলচ্চিত্রগুলোর বিষয়সমূহের মধ্যে যেমন আছে রাজনীতি, বহুসংস্কৃতিবাদ, আন্তঃসাংস্কৃতিক যোগাযোগ তেমনি আছে নির্মাতার নতুন ইন্দোনেশিয়ার স্বপ্ন। এক বাক্যে চলচ্চিত্রগুলো নান্দনিক অর্থে চিত্তাকর্ষক এবং আর্থ-রাজনৈতিক বার্তাবাহী।

leipzig

বিশেষ গুরুত্ব সহকারে প্রদর্শিত হয় নন্দিত চলচ্চিত্র উৎসব ডক-লাইপজিগের নির্বাচিত চলচ্চিত্রসমূহ। এটি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীনতম প্রামাণ্য ও অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র উৎসব। ১৯৯৫ সনে অভিষেক হওয়া এ উৎসব তদানীন্তন পূর্ব জার্মানির পয়লা স্বাধীনধারার চলচ্চিত্র উৎসব। অ্যানিমেশন, ফিকশন ও ডকুমেন্টারি ধারায় নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে নিঃসঙ্গ পিতৃত্ব, নারী ও মানসিক বৈকল্য, পাগলখানা, বোমা সন্ত্রাস ইত্যাদি। এই সেশনের মধ্যে দিয়ে সমকালীন প্রামাণ্য অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রিক প্রবণতার সাথে চেনা-পরিচয়ের সুযোগ ঘটে দর্শকদের।

o-plaপোলিশ অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র অধিবেশনে প্রদর্শিত হয় পোল্যান্ডের নির্মাতাদের নির্মিত চলচ্চিত্রসমূহ। এই অধিবেশনের লক্ষ্যণীয় মাত্রাটি হলো, এখানে একসাথে এক ঝাঁক পরিচিত, শৌখিন এবং সদ্য অভিষিক্ত নির্মাতাদের কাজের সাথে পরিচয় ঘটে। কারিগরি, শৈলী এবং আবেগের উদ্ভিন্ন মিশেল লক্ষ্য করা যায় এই অধিবেশনে। বাজেট/বিনা বাজেট এ নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর পেছনে কাজ করেছে গল্পবাজ নিরীক্ষাধর্মী নির্মাতাদের মনন-দর্শন। অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের বার্ষিক কর্মসূচি ও!পিএলএ ফি-বছর পোল্যান্ডের পদক জয়ী ও সেরা কাজগুলো বাছাই করে সংকলন করে থাকে। ঢাকায় প্রদর্শিত চলচ্চিত্রগুলোও সেই কর্মসূচীর অংশ।

এই উপমহাদেশে সেভেন সিস্টার্স  বলতে বোঝানো হয় ইন্ডিয়ার উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের নাগাল্যান্ড,মণিপুর,মিজোরাম,আসাম,ত্রিপুরা, মেঘালয় ও অরুণাচল-এ সাতটি রাজ্যকে।  স্বাধীনতার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলগুলোতে আন্দোলন চলে আসছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্মলগ্ন থেকেই সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

Northeast_India_States.svg
সৌজন্য- উইকিমিডিয়া

এই রাজ্যগুলোর সাথে বাংলাদেশের স্থল সীমানা রয়েছে। ভাষা, সংস্কৃতি, জীবন, যাপন-এ প্রায় সাদৃশ্য সম্পন্ন অঞ্চলগুলোর সাথে বাংলাদেশের বিচ্ছেদ ঘটে ১৯৪৭ সনে ভারত ভাগের দরুন। বৈশ্বিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে বর্তমান সময়ে নতুন মোড় নিচ্ছে বাংলাদেশ ও সেভেন সিস্টার্সের যোগাযোগ। এহেন দশার প্রেক্ষিতে, স্পেশাল ফিল্ম সেশনের অধীনে ১৪তম আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসবে পরিবেশিত হয় ন্যো ইউর নেইবারস্‌ শিরোনামের অধিবেশনটি। এখানে সাতটি রাজ্যের নির্বাচিত সাতটি মুক্তদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রতিবেশী অঞ্চলসমূহের জনজীবন, ভাবনা, প্রকৃতি, প্রাণ, প্রতিবেশ ও প্রতিরোধের গাঁথা তুলে ধরা হয়।

উৎসবের শেষ পর্যায়ের নির্ধারিত আয়োজন ছিল জাতীয় সেমিনার। সরকার ও মুক্ত চলচ্চিত্র শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে প্রধান বক্তা হিসেবে অলিখিত বক্তব্য পেশ করেন বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের সভাপতি ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ-এর অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন রাজু।

National seminar panel by Abid Mallick
সৌজন্য- আবিদ মল্লিক

যদিও প্রধান বক্তা অধিবেশনের প্রারম্ভে বিকল্প শিরোনাম প্রস্তাব করেন, রাষ্ট্র ও মুক্ত চলচ্চিত্র। এ প্রসঙ্গে, মিশেল ফুকোর গর্ভনমেন্টাল তত্ত্ব-এর বয়ানে রাষ্ট্র/সরকার এবং মুক্ত চলচ্চিত্রের সার্বভৌমত্ব, পারস্পারিক দ্বন্দ্ব ও নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গটি তুলে ধরেন। তিনি আরো ঘটনাচক্রের উদাহরণ দিয়ে মুক্ত চলচ্চিত্রের প্রতিরোধী ভূমিকা নিয়ে আলাপ করেন। প্রসঙ্গক্রমে, বাংলাদেশের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আন্দোলন ও রাষ্ট্রের ভূমিকার বিষয়ে মন্তব্য করেন। তবে, রাষ্ট্র/সরকার বিষয়ক আলোচনায় মুক্ত চলচ্চিত্র বনাম সেন্সর-এর জরুরতের উপাঙ্গটি গরহাজির থাকে।

এবারের উৎসবে ইন্টারন্যাশনাল কম্পিটিশন (ফিকশন) বিভাগে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয় রুশ নির্মাতা জর্জ পরোটভ এর ফ্যামিলি অফলাইন (২০১৫)। একই বিভাগে স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ডে মনোনীত হয়েছে ইরানি নির্মাতা ইসমায়েল মোনসেফ এর আর্দাক (২০১৫)। এই বিভাগে জুরির দায়িত্ব পালন করেন গ্যারিন নুগ্রহ (ইন্দোনেশিয়া),অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম (বাংলাদেশ),আজার ফারামারজি (ইরান)।

15193675_1360556643963713_791168787260254286_n

ইন্টারন্যাশনাল কম্পিটিশন (ডকুমেন্টারি) বিভাগে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয় বাংলাদেশ-কানাডা নিবাসী নির্মাতা সাইফুল ওয়াদুদ এর ঝলমলিয়া- দ্য স্যেকরেড ওয়াটার (২০১৬)। এই শাখায় জুরির দায়িত্ব পালন করেন নীলোৎপল মজুমদার (ভারত),মার্শেল মাইগা (জার্মানি),মাহমুদুল হোসেন (বাংলাদেশ)।

maru mother

নেটপ্যাক (নেটওয়ার্ক ফর এশিয়ান সিনেমা) জুরি অ্যাওয়ার্ড বিভাগে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্বাচিত হয় আফগান চলচ্চিত্রকার সাদাম ওয়াহিদি এর ম্যারি মাদার (২০১৬)। চালিদা উয়াম্বুমরণজিৎ (থাইল্যান্ড),ড. ধাম্মিকা দিশানায়াকা (শ্রীলংকা),গোলাম রাব্বানী বিপ্লব (বাংলাদেশ)-জুরির দায়িত্ব পালন করেন।

তারেক শাহরিয়ার ইন্ডিপেন্ডেন্ট শর্ট বিভাগে স্থানীয় তরুণ প্রতিভাবান চলচ্চিত্র নির্মাতাদের পুরুষ্কৃত করা হয়। তাসমিয়াহ আফরিন মৌ এরকবি স্বামীর মৃত্যুর পর আমার জবানবন্দি (২০১৬) শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র এবং আবিদ মল্লিক এর পথ (২০১৬) চলচ্চিত্রটি একই বিভাগে স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ড লাভ করে। এ বিভাগে জুরির দায়িত্ব পালন করেন জাহিদুর রহিম অঞ্জন,ড. সাজেদুল আউয়াল ও শবনম ফেরদৌসি।

উৎসবের সমাপনী দিনে বিজয়ী নির্মাতা ও  শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসমূহের নাম ঘোষণা ও পুরস্কৃত করা হয়। এ অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি। তাঁর বক্তব্যে পুরষ্কার বিজয়ীদের শুভেচ্ছা জানান, ব্যাপক কলেবরে উৎসব সমাধা করবার জন্য আয়োজক সংগঠন এর প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। বিজয়ী ও নবীন নির্মাতারা  আসন্ন সময়ে দর্শকদের ভালো গল্প ও সুষমামণ্ডিত চলচ্চিত্র নিয়মিত উপহার দিবে বলে আরো আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

২০১৬ সালের ১৪তম সংস্করণের উৎসব পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু;উৎসব পরিচালকের পদে সক্রিয় ছিলেন শর্ট ফিল্ম ফোরামের পরীক্ষিত কর্মী সৈয়দ ইমরান হোসেন কিরমানী।

“সাংস্কৃতিক আন্দোলনের উদ্দীপনার কাছে আর্থিক সীমাবদ্ধতা কোন কঠিন বাঁধা নয়। তাই, ফোরামের পক্ষে সর্বদা সম্ভব হয় যাবতীয় বিপত্তি অতিক্রম করে এত বড় চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজন করবার”- আয়োজকদের দায়িত্ববোধ ও দায়বদ্ধতার কথাটি এভাবেই জানালেন উৎসব পরিষদের সভাপতি নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু।

উৎসব পরিচালক সৈয়দ ইমরান হোসেন কিরমানী মনে করেন-“সবার স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিই এবারের উৎসবটিকে পরিপূর্ণতা দান করেছে।”

15442151_1757638241227913_1638410269584577732_n

পরিসংখ্যানগত দিক থেকে এবং সংখ্যাতাত্ত্বিক বাস্তবতার নিরিখে ১৪তম সংস্করণ-কে সফল বলা যেতে পারে। ১৪তম আন্তর্জাতিক স্বল্পদৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসবে ১০৮ টি দেশ থেকে প্রায় ২৫০০ চলচ্চিত্রের মধ্যে বাছাইকৃত প্রায় পাঁচ শতাধিক স্বল্প/মুক্তদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এর সাথে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। এবারের উৎসবের মূল ভেন্যু জাতীয় গণগ্রন্থাগারের শওকত ওসমান স্মৃতি মিলনায়তনের পাশাপাশি জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তন ও সুফিয়া কামাল মিলনায়তন, শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় সংগীত,আবৃত্তি ও নৃত্যকলা মিলনায়তনে এবং বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের মিলনায়তনসহ পাঁচটি স্থানে চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হয়। এছাড়া একই সময়ে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এ তিনদিনব্যাপী এবং রাজশাহী মহানগরে চারদিনব্যাপী উৎসব উদযাপিত হয়।

15349810_1414939088569812_1100838177455754607_n

এটি দারুণ উদ্যোগ তবে বিপত্তি ঘটে চলচ্চিত্রের শিডিউলিং নিয়ে, দেখা গেছে একই সময়ে একাধিক জরুরী ছবির প্রদর্শন সূচী বহাল থাকায় বাধ্য হয়ে দর্শককে যে কোন একটি বেছে নেয়ার মত শাঁখের করাত তলে পড়তে হয়েছে। মেঘবার্তা বা অনলাইন মাধ্যমে বিশেষ করে উৎসবের ওয়েবসাইটে তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব পায় নাই। ফলে, দর্শক-গুণগ্রাহীদের মাঝে একধরনের যোগাযোগ বিভ্রাট ঘটে থেকেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংস্কৃতিতে ভিন্ন মাত্রা লক্ষ্য করা যাচ্ছে- যেখানে নতুন প্রযোজক তৈরি হচ্ছে, যুক্ত হচ্ছে বিনিয়োগকৃত লগ্নি মুনাফা সমেত তুলে আনার নব নব ব্যবসায়িক ফিকির-বিষয়গুলো ইতিবাচক বটেই; তবে এতে মাধ্যম হিসেবে সিনেমার শৈল্পিক উৎকর্ষ সাধিত হচ্ছে কী না বা জাতি-রাষ্ট্র এর প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সিনেমা চলচ্চিত্র-ভাষায় কতটুকু যোগ করতে পারছে…সেটি বোধহয় আঁধারেই রয়ে যায়। আমাদের মাথায় আরো গেঁথে গেছে বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা প্রচারিত সাম্য/বৈষম্য, সুস্থ/অসুস্থ, নির্মল/দূষিত পরিবেশের বর্ণনামূলক ধারণা।  ফলতঃ অনেক অনেক, অগণিত ভালো, ব্যবসা সফল সিনেমা প্রকাশিত হচ্ছে, কিন্তু লোকাল দৃশ্যপটে সৎ সিনেমার হদিশ মিলছে না।

উৎসব অংশগ্রহণকৃত স্থানীয় সিনেমাসমূহের অধিকাংশের গায়ে প্রকরণগত উৎকর্ষতার ছাপ থাকলেও প্রতীতিগত মাত্রার অন্বেষণে সেগুলো যেন দৃশ্যমান ঘটনার উপরিতলে মুখ থুবড়ে পড়ে, ব্যর্থ হয় জায়মান সময়কে খুঁড়ে ঘটমান বাস্তবতার গভীর তল হতে সত্যের মত অনাথকে সেঁচে তুলতে। ফিল অ্যান্ড লুক বা বোধ ও দেখনদারির খেলায় চলচ্চিত্রগুলো উৎরে গেলেও যাপিত জীবনের সংকটের নিদান হয়ে উঠতে পারে না।

crop-1024x594

আরো একটি বিষয় চোখে আটকে গেলো-তা হলো নবীন/প্রবীণ/বর্ষীয়ান নির্মাতাদের ভিনদেশি উৎসব প্রীতি, যা ভাবায়- ফর্মুলা শুধু বাণিজ্যিক সিনেমার উপাদান নয়, স্বাধীন ধারার/মুক্তদৈর্ঘ্যের বাজারেও এর বেশ কদর আছে,আছে নিজস্ব চেহারা, রাজনীতি। ফলে, বাকিটা নির্মাতার চয়েস:তিনি জুতোর মাপে পা কাটবেন নাকি পায়ের মাপে জুতো গড়বেন। পৃথিবী যখন কোন বাস্তবতা ধারণের প্রশ্নে অর্জিত জ্ঞান, চিন্তা, অভিজ্ঞতা এবং মর্ম দ্বারা বিচারে রত, তখন আমরা যেন শুধুই বুদ্ধিজীবিক বাস্তবতার দোহাই দিয়ে বিরত থাকছি সময়ের প্রশ্নটি উচ্চারণ করা থেকে। বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের অন্যতম যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য- স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণকাণ্ডে গণমুখী, প্রগতিশীল মতাদর্শগত চরিত্রটি অক্ষুণ্ণ রাখা …এর প্রতিফলিত রূপ অবর্তমান রয়ে যায় উৎসবে অংশগ্রহণকৃত লোকাল নির্মাতাদের বেশিরভাগ কাজে। ফলে,  দৈর্ঘ্যের আপাত মুক্তি ঘটলেও, আত্মিক অনধীনতা ও সেলফ সেন্সরের প্রকোপ থেকে রেহাই মেলে না সিনেমার।

৩ ডিসেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত আটদিন ব্যাপী স্থায়ী দ্বি-বার্ষিক এ উৎসবের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সহায়তা দিয়েছে বেঙ্গল গ্রুপ লিমিটেড। উৎসবে বিভিন্ন অধিবেশন আয়োজন ও পরিচালনায় সহায়তা করেছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ ব্যাংকার্স ও শিক্ষা ও সংস্কৃতি সহায় ফাউন্ডেশন।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s